বিএনপির একক প্রার্থী, অন্য দলের প্রার্থীরাও রয়েছেন গণসংযোগে
সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা গণসংযোগে রয়েছেন। ভোটাররাও হিসাব মেলাচ্ছেন কোন প্রার্থীর দিকে ঝোঁকবেন তারা । কোন দলের কে প্রার্থী, দেশের কল্যাণে কোন দলকে ভোট দিতে হবে, কোন প্রার্থীকে ভোট দিলে এলাকার উন্নয়ন বেশি হবে। নির্বাচনের মাঠে আসার আগে কোন প্রার্থী জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন সব চিন্তা-ভাবনা মাথায় রেখেই ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিবেন ভোটাররা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত মুরাদনগর আয়তনের দিক থেকে জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা। শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্যের পাদপীঠ এই মুরাদনগর একটি প্রাচীন ঐতিহ্য সমৃদ্ধ জনপদ। এখানকার মানুষ খুবই সচেতন। তারা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্ধবিশ্বাসে নয়, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার আলোকে তারা তাদের ভোট প্রদান করবেন। ফলে এই মুরাদনগরের প্রার্থী মনোনয়নে কোনো দল ভুল করলে আসনটি তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এখানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। আওয়ামী লীগর সাধারণ কর্মীরা বিভিন্ন দলে মিলে আছে। সমর্থকরা আছেন চুপচাপ আর যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল তারা এখন এলাকাছাড়া। বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপি কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে অনেকটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছে সাবেক পাঁচবারের সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। তিনি মন্ত্রিপরিষদেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হামলার আসামি হওয়ায় দীর্ঘদিন তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করায় জনগণের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সব মামলা থেকে খালাস পেয়ে দেশে ফিরেন কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। এখন তিনি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্তরা বাড়ানোর চেষ্টায় রয়েছেন। গত ৫ আগস্টের পর নানা কারণে তার জনপ্রিয়তা কিছুটা কমলেও বিএনপির প্রতীক ধানের শীষের ভোট আর ব্যক্তি ইমেজে মোটামুটি ভালো অবস্থানে রয়েছেন দলটির ভাইসচেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।
দেশের অন্যতম বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বাংলদেশ জামায়াতে ইসলামীও এই আসনে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে দলটি প্রাথমিকভাবে যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে তাতে উপজেলার জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ দায়িত্বশীল মনোক্ষুন্ন। একইসঙ্গে জামায়াতের মহিলা বিভাগ, ইসলামী ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থার নেতৃবৃন্দও এতে সন্তোষ্টু নন। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ অস্তোষ যাতে বাইরে না আসে সে কারণে তারা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। এই আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল ‘মানবিক ডাক্তার’ খ্যাত ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও দলটির ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মজলিসে শুরার অন্যতম সদস্য ডা. মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসেন মনোনয়ন পাবেন। কিন্তু প্রাথমিক মনোনয়নে তার নাম ঘোষণা না করায় দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাধারণ ভোটাররাও হতাশ। কারণ, ডা. মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসেন গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে মুরাদনগরে দল মত নির্বিশেষে সবাইকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। ঢাকায় পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত এলাকায় চিকিৎসা সেবা দিয়ে চলছেন। ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের স্বাস্থ্য বিভাগের এই পরিচালক মুরাদনগরের সংগঠনের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দাওয়াতে অসংখ্যা সাধারণ মানুষ দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ছাড়াও নানা প্রয়োজন মেটাতে পাশে ছিলেন ডা. তফাজ্জল। গত ৩৫ বছর ধরে জনসেবায় নিয়োজিত এই ডাক্তার সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন লক্ষ্য-কোটি টাকা। ফলে দলীয় নেতাকর্মী ও সেবা ও সহযোগিতাপ্রাপ্ত মানুষরা ডা. তফাজ্জল হোসেনকেই জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। অন্যদিকে জামায়াতের প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত ইউসূফ হাকিম সোহেল সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বশীল নন, কুমিল্লা উত্তর জেলা ইউনিটের রুকন (সদস্য) তিনি। সংগঠনের বড় কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। এলাকার মানুষের সঙ্গেও তার পরিচিতি নেই। তবে ২০০৯ সালে বিএনপির সঙ্গে স্থানীয় পার্যায়ে সমঝোতার ভিত্তিতে করা নির্বাচনে তিনি উপজেলা ভাইসচেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনি এলাকায় সাংগঠনিক বা সামাজিক কোনো কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন না স্থানীয়রা জানিয়েছেন। জামায়াতের সাধারণকর্মীরা চাচ্ছেন এলাকায় সুপরিচিতি ‘মানবিক ডাক্তার’ মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসেনকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দিক দল। যদি তা করা সম্ভব না হয় তাহলে এ আসনটি নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাবে বলে মনে করছেন তারা।
এ আসনে গণসংযোগ করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম। তিনি অত্যন্ত ক্লিন ইমেজের লোক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকায় এলাকাবাসীর কাছে তার গুরুত্ব রয়েছে অনেক। এলাকার মানুষের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ততা বাড়াতে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। সপ্তাহে অন্তত দুইদিন তিনি নির্বাচনীয় এলাকায় অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, মানুষ ৫৪ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন দলের শাসন দেখেছে। এখন তারা নতুন কোন দলকে অর্থাৎ ইসলামি দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। মানুষ পরিবর্তন চায়। সন্ত্রাস দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত সমাজ চায়। মানুষ তাদের সন্তানদেরকে নিয়ে মাদকমুক্ত পরিবেশে বাঁচতে চায়। মানুষ তাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে চায়। মারামারি হানাহানি খুন ধর্ষণের রাজনীতি দেখতে চায় না। প্রতিহিংসা রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না। আমরা মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি, তারা আমাদেরকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করছে।
এ আসনে আলোচনায় রয়েছেন, জুলাই যোদ্ধা ও অন্তবর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নির্বাচনের তফসিলের আগেই তিনি উপদেষ্টার পর থেকে পদত্যাগ করবেন বলে আগেই জানিয়েছিলেন এই যোদ্ধা। তবে শোনা যাচ্ছে তিনি ঢাকার একটি আসন থেকে ভোট করতে চাচ্ছেন।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ যে সমমনা আটটি দল যুগপৎ কর্মসূচিতে রয়েছে, এই আসনে যদি এই সমমনাদের ভোট এক মার্কায় আসে তাহলে এখানে ইসলামপন্থীদের জন্য চমক আসতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রার্থী মনোনয়নে অবশ্যই বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে মনোনয়ন বোর্ডকে।