সাত জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড শূন্য, আটকে আছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি
বাংলাদেশের জীবন বিমা খাতে ভয়াবহ সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত সাতটি জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড এখন শূন্য বা ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে আছে প্রায় ১৩ লাখ গ্রাহকের চার হাজার কোটি টাকার বেশি বিমা দাবি।
আইডিআরএ’র ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানির মোট লাইফ ফান্ড যেখানে ৩৬ হাজার কোটি টাকা, সেখানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফান্ড কার্যত নিঃশেষ হয়ে গেছে। লাইফ ফান্ড থেকেই গ্রাহকদের মৃত্যু দাবি, মেয়াদপূর্তি ও সারেন্ডার ভ্যালুর টাকা পরিশোধ করার কথা থাকলেও ফান্ডে অর্থ না থাকায় বহু প্রতিষ্ঠান এখন দাবি মেটাতে অক্ষম।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ড পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গেছে এবং প্রায় ৪৫৩ কোটি টাকা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এই কোম্পানির কাছেই গ্রাহকদের প্রায় ২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে।
এ তালিকায় আরও রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স, শান্তা লাইফ ইনস্যুরেন্স, স্বদেশ লাইফ, প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ এবং যমুনা লাইফ ইনস্যুরেন্স। এসব প্রতিষ্ঠানের লাইফ ফান্ডে হয় কোনো অর্থ নেই, নয়তো তা ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। ফলে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ কার্যত বন্ধ বা চরমভাবে বিলম্বিত হচ্ছে।
আইডিআরএ’র হিসাব বলছে, জীবন বিমা খাতে মোট অনিষ্পন্ন দাবি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি কোম্পানিতেই আটকে আছে প্রায় ৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা, যা মোট বকেয়ার প্রায় ৮৮ শতাংশ।
বিমা আইন অনুযায়ী, পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে বহু গ্রাহককে পাঁচ থেকে দশ বছর, এমনকি এক যুগের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চেক ইস্যু করলেও ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তা ডিজঅনার হচ্ছে—যা নতুন করে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, দাবি পরিশোধের বদলে বারবার ‘ফাইল প্রক্রিয়াধীন’, ‘কাগজ অসম্পূর্ণ’ কিংবা ‘পরবর্তীতে আসুন’—এ ধরনের অজুহাত দেওয়া হচ্ছে। অনেক শাখা অফিস কাগজে থাকলেও বাস্তবে বন্ধ, কোথাও কর্মকর্তা নেই, কোথাও তালা ঝুলছে।
আইডিআরএ’র একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, লাইফ ফান্ড শূন্য মানে প্রতিষ্ঠান কার্যত দেউলিয়া। তবে বর্তমান আইনি কাঠামোয় লাইসেন্স বাতিল বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা সংস্থাটির সীমিত।
বিমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাইফ ফান্ড একটি জীবন বিমা কোম্পানির প্রাণস্বরূপ। এই তহবিল দুর্বল হলে গ্রাহকের অর্থ সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারি, কোম্পানির মালিকদের লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এই সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
আইডিআরএ জানিয়েছে, প্রয়োজনে দায়গ্রস্ত কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের পাওনা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে কবে নাগাদ গ্রাহকেরা বাস্তবে অর্থ ফেরত পাবেন—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।