খেলাপি ঋণ ও শেয়ার দর নিয়ে চাপে আইপিডিসি ফাইন্যান্স
খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, নিট সুদ আয় হ্রাস এবং শেয়ার দরের অস্বাভাবিক উত্থান—এই তিন কারণে চাপে পড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক আর্থিক তথ্য ও শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে আইপিডিসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৫ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে আইপিডিসি জানিয়েছে, কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে কিছু গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন। পাশাপাশি পুনঃতফসিলকৃত ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং ঋণ শ্রেণিকরণে রক্ষণশীল নীতি অনুসরণের কারণেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।
অন্যদিকে, কোম্পানিটির নিট সুদ আয়ও কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে নিট সুদ আয় ছিল ২৩৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ২০০ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়। ফলে এক বছরে নিট সুদ আয় কমেছে প্রায় ৩৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বা ১৬ শতাংশ।
তবে আইপিডিসি কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে কিছু আয় সুদ আয়ের পরিবর্তে বিনিয়োগ আয় হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে মোট সুদ আয় বৃদ্ধি পেলেও নিট সুদ আয়ে তার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও নিট সুদ আয় কমে যাওয়া কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়। এতে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে সম্প্রতি আইপিডিসির শেয়ার দরের অস্বাভাবিক উত্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২ জুন শেয়ারটির দাম ছিল ১৮ টাকা ৯০ পয়সা। মাত্র ১২ কার্যদিবসের ব্যবধানে ১৮ জুন তা বেড়ে ২৯ টাকা ৬০ পয়সায় পৌঁছে যায়, যা প্রায় ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি।
শেয়ার দরের এই অস্বাভাবিক উত্থানের কারণ জানতে ডিএসই কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাইলেও আইপিডিসি জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছিল না যা দর বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ডিএসইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে সম্ভাব্য কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, অস্বাভাবিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে।
বিএসইসির মুখপাত্র আবু লকালাম জানিয়েছেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্যই এ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি উদ্বেগের বিষয়। আইপিডিসি ফাইন্যান্সের সার্বিক পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষণ করছে।
বর্তমানে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের পরিশোধিত মূলধন ৪২৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট শেয়ারের ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তাদের, ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ সরকারের, ১৯ দশমিক ১২ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের এবং ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।