সালতা ক্যাপিটালে শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সদস্য প্রতিষ্ঠান সালতা ক্যাপিটাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের নগদ অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ দুই কর্মকর্তা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বিএসইসি ও ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, সালতা ক্যাপিটালের প্রায় ১৪ হাজার গ্রাহক রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি সমন্বিত গ্রাহক হিসাব (কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট) থেকে প্রায় ২৭ কোটি টাকা অবৈধভাবে সরিয়ে নিয়েছে। এছাড়া গ্রাহকদের বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাবের প্রায় ৭২ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাঈদ মো. শহীদুল্লাহ্ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। তারা বর্তমানে দেশে রয়েছেন নাকি বিদেশে অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের ক্ষেত্রে ব্যাকঅফিস সফটওয়্যারের একাধিক ভুয়া ভার্সন ব্যবহার করে জালিয়াতি করেছে সালতা ক্যাপিটাল। তারা স্টক এক্সচেঞ্জকে এক ধরনের ডেটা দেখাত, আর সাধারণ গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করতে সফটওয়্যারের অন্য একটি ফেক (ভুয়া) ভার্সন ব্যবহার করত। ফলে গ্রাহকরা তাদের বিও হিসাবে যে অর্থ ও শেয়ারের স্থিতি দেখতেন, তা ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

এছাড়া অধিকাংশ গ্রাহকের মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল আপডেট না থাকার সুযোগে এই জালিয়াতি করা আরও সহজ হয়।

ডিএসইর মনিটরিং বিভাগ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রাথমিক তদন্তে অনিয়মের বিষয়টি শনাক্ত করে বিএসইসিতে প্রতিবেদন পাঠায়। পরবর্তীতে বিএসইসি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন করলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুঁজিবাজারে গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা মন্দার মধ্যেও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর এমন বেপরোয়া লুটপাট বিনিয়োগকারীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ২০১০ সালের ধসের পর থেকে এ পর্যন্ত তামহা সিকিউরিটিজ, মউর সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, বাঙ্কো সিকিউরিটিজসহ অন্তত এক ডজন প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্তরা টাকা ফেরত পাননি।

সর্বশেষ ২০২৩ সালে ডিএসইর ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) থেকে তিনটি ব্রোকারেজ হাউসের আংশিক গ্রাহকদের মাত্র ৩৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, যা লুণ্ঠিত অর্থের তুলনায় সামান্য।

সালতা ক্যাপিটালের মালিকরা কোথায় আছেন, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি অন্য ব্রোকাররা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একজন পরিচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএসইসি কারসাজিকারকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে জরিমানা করলেও বিনিয়োগকারীদের সর্বস্ব আত্মসাৎকারী ব্রোকারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি আত্মসাতের ঘটনা জানার পরও এই অপরাধীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিতে কালক্ষেপণ করে, যা রহস্যজনক।

এ বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, সালতা ক্যাপিটালের প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে সরাসরি বলপ্রয়োগের (এনফোর্সমেন্ট) এখতিয়ার ডিএসইর নেই; তদন্ত প্রতিবেদন বিএসইসিতে পাঠানোর পর তারাই চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়।

তিনি আরও জানান, এই ধরনের জালিয়াতি রিয়াল টাইমে ঠেকানোর মতো ডিজিটাল টুলস বর্তমানে না থাকায় লাইসেন্স নবায়ন বা আকস্মিক পরিদর্শনের সময় ছাড়া এই গ্যাপগুলো ধরা পড়ে না। তবে এ ধরনের বিপর্যয় রুখতে এবং সিসি অ্যাকাউন্টের রিয়াল টাইম ডেটা যাচাইয়ে ডিএসইর নিজস্ব টিম একটি বিশেষ সফটওয়্যার ডেভেলপ করছে, যা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত এবং বর্তমানে ডেভেলপমেন্ট স্টেজে রয়েছে।

আগামী তিন মাসের মধ্যে এই সফটওয়্যারটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করে নুজহাত আনোয়ার বলেন, এটি চালু হলে প্রতিদিন দিনশেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাবের মিলকরণ (রিকনসিলিয়েশন) করা যাবে। ব্রোকারদের ব্যাংক হিসাব সরাসরি দেখার আইনি এখতিয়ার ডিএসইর না থাকায়, এই সফটওয়্যারের সাথে ব্যাংকিং সিস্টেম কানেক্ট করতে ব্রোকারদের কাছ থেকে একটি ইনডেমনিটি চুক্তি নেওয়া হবে।

এর ফলে দিনশেষে ডিএসইর ম্যাচিং ইঞ্জিনের ট্রেডের সাথে ব্রোকারেজ হাউসের তহবিলে কোনো অমিল বা গ্যাপ পেলেই সিস্টেম একটি সতর্কবার্তা (ফ্ল্যাগ রেজ) দেবে, যার প্রেক্ষিতে পরের দিন সকালেই জবাবদিহি চাওয়া বা আকস্মিক পরিদর্শন টিম পাঠানো সম্ভব হবে।

আরো