ভল্ট থেকে অর্থ উধাও, অগ্রণী ব্যাংকে জালিয়াতির একের পর এক ঘটনা
রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় একের পর এক ঘটছে জাল-জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, ভল্ট চুরি ও আর্থিক অনিয়মের ঘটনা। এর ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তদারকি কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির একাধিক সূত্র বলছে, দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণেই মূলত ধারাবাহিক ঘটছে এসব অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। আর অনেকগুলো ঘটনা ব্যাংকটির বর্তমান এমডি আনোয়ারুল ইসলামের সময়ে সংঘটিত হওয়ায় ব্যাংক পরিচালনায় তার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ব্যাংকটির কিছু কর্মকর্তা।
খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, অগ্রণী ব্যাংকের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শাখায় সংঘটিত হয়েছে সবচেয়ে বড় আত্মসাতের ঘটনা। রংপুর সার্কেল প্রধান জিএম স্বপন কুমার ধর, সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমাল জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এ ঘটনায় আলিমুল আল রাজি তমাল বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, তমাল সিএনজি লেজারে মোট ১৩২,২৬,২২,৯৮১ টাকা (ডেবিট ও ক্রেডিট উভয়) ভুয়া লেনদেন সৃষ্টি করেন। এর মধ্যে তিনি ০৩/১২/২০২৫ তারিখে ৩০,০০,০০,০০০ টাকা, ২৮/১২/২০২৫ তারিখে ৭,০৭,৩৪,৮১১ টাকা সিএনডি লেজারে ভুক্তি দেন। এছাড়া ০৬/১২/২০২৫ তারিখে ইস্যুকৃত ৫,৭৮,৩৪,৮১১ টাকার একটি আইবিডিএ চেক কালেকশন না করে ড্রয়ারে ফেলে রাখেন। এর ফলে ৩০,০০,০০,০০০ টাকা ও ৭,০৭,৩৪,৮১১ টাকা এবং ৫,৭৮,৩৪,৮১১ টাকা মিলিয়ে মোট ৪২,৮৫,৬৯,৬২২ টাকা হিসাব বহির্ভূত স্থিতি সৃষ্টি হয়। এই অর্থ সমন্বয় করা সম্ভব না হওয়ায় পুরো টাকাই আত্মসাৎ হয়েছে বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া আরও বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ২৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। সব মিলিয়ে আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬৬ কোটি টাকা।
অর্থ আত্মসাতের আরো যত ঘটনা
ব্যাংকটির দ্বিতীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর শাখায়। শাখার ভল্ট থেকে ১০ কোটি ১৩ লক্ষ ৬২ হাজার ৩৭৮ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শাখার প্রধান তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তার কর্মকর্তারা হলেন- অগ্রণী ব্যাংক কাশিনাথপুর শাখার প্রিন্সিপ্যাল অফিসার আবু জাফর, ব্যবস্থাপক হারুন বিন সালাম ও ক্যাশিয়ার সুব্রত চক্রবর্তী।
জানা গেছে, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অগ্রণী ব্যাংক রাজশাহী বিভাগীয় ও পাবনা আঞ্চলিক শাখা থেকে পাঁচ কর্মকর্তা আকস্মিক অডিটে যান কাশিনাথপুর শাখায়। অডিটে শাখায় ১০ কোটি ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৩৭৮ টাকা আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। অডিট কর্মকর্তা বিষয়টি সাঁথিয়া থানায় জানালে পুলিশ অভিযুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান।
এরপর, চাঁদপুরের মতলব উত্তরে অগ্রণী ব্যাংকের ছেংগারচর বাজার শাখার ভল্ট থেকে ৭৫ লাখের বেশি টাকা নিয়ে ব্যাংকটির ক্যাশ কর্মকর্তা দীপঙ্কর ঘোষ (৩৭) উধাও হয়ে যান। এ ঘটনায় মতলব উত্তর থানায় একটি মামলা করেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ মিয়া। অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে চার সদস্যের একটি কমিটি করা হয়।
ব্যাংকের কার্যালয় ও একাধিক গ্রাহক সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত কর্মস্থলে ছিলেন দীপঙ্কর ঘোষ। ওই দিন সন্ধ্যায় ব্যাংকের ভল্টে ১ কোটি ২ লাখ টাকা জমা রাখেন ব্যাংকটির শাখা কর্তৃপক্ষ। ভল্টের চাবি ছিল ক্যাশ কর্মকর্তা দীপঙ্করের কাছে। তিনি সেখান থেকে গোপনে ৭৫ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে বাসায় চলে যান। পরে বাসায় তালা দিয়ে ওই দিন রাতেই কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে যান। ভাড়া বাসার মালিক বা আশপাশের কাউকেই কিছু বলেননি। পরদিন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ও অন্যা কর্মকর্তারা এসে দেখেন, ব্যাংকের ভল্ট খোলা এবং সেখানে ৭৫ লাখ ২০ হাজার টাকা নেই। এর পর থেকে দীপঙ্করের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
সূত্র জানায়, ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। পরে ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ইউসুফ মিয়া বিষয়টি অগ্রণী ব্যাংকের চাঁদপুর অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) তপন চন্দ্র সরকারকে জানান। কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ব্যবস্থাপক থানায় মামলা করেন। এছাড়া, অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে চার সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। একজন জ্যেষ্ঠ প্রধান কর্মকর্তার (এসপিও) নেতৃত্বে তদন্ত ও নিরীক্ষা (অডিট) হয়।
ব্যাংকটির একটি সূত্রে জানা গেছে, উপরে উল্লেখিত ঘটনাগুলো ছাড়াও সেন্ট্রাল ল’ কলেজ শাখায় ক্লিয়ারিং সাসপেন্স হিসাব থেকে কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা, বগুড়ার ভাটারা শাখার কয়েক কোটি টাকার নগদ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি ও আক্কেলপুর শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা, নারিশা বাজার শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা, আন্তাবারাহা শাখায় সঞ্চয়পত্রের অর্থ আত্মসাৎ, কলাকোপা শাখা ও পাবনার সুজানগর শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
ব্যাংকটির আরেকটি সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ব্যাংক কোম্পানী আইন ১৯৯১ এর ১৫ (গ) (৩) এ রয়েছে ”অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তি একই সময়ে ব্যাংক-কোম্পানীর কোন চুক্তি বা লেনদেনে সংযুক্ত হইতে বা ব্যাংক-কোম্পানীর প্রতিনিধিত্ব করিতে পারিবে না।]” কিন্তু অগ্রণী ব্যাংকের এমডি উক্ত আইন লঙ্ঘন করে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত জিএম ইখতিয়ার উদ্দিন কে অগ্রণী ব্যাংক কুমিল্লা সার্কেল প্রধান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেছেন। একইভাবে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এর জিএম মোঃ ফজলুল করিম কে ব্যাংকের রাজশাহী সার্কেল প্রধান করেছেন।
এসব বিষয়ে জানতে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ হয়নি।