আস্থা ফেরাতে কঠোর পথে আইডিআরএ নতুন চেয়ারম্যান

বছরের পর বছর গ্রাহকের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেয়াদ শেষে কিংবা দুর্ঘটনা-দুর্যোগে বিমা দাবি উঠলে অনেক গ্রাহককে ঘুরতে হয়েছে কোম্পানির দ্বারে দ্বারে। কোথাও আর্থিক দুর্বলতা, কোথাও ব্যবস্থাপনার অনিয়ম, আবার কোথাও নিয়ন্ত্রক তদারকির ঘাটতি—সব মিলিয়ে দেশের বিমা খাতে তৈরি হয়েছে গভীর আস্থার সংকট। দীর্ঘদিনের এই সংকট কাটিয়ে গ্রাহকের আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বাস্তবতায় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মীর নাদিয়া নিভিনের কর্মকাণ্ডে কঠোর সংস্কারের বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গ্রাহকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিমা খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছেন তিনি। প্রয়োজনে দুর্বল কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের অবস্থান নিয়েছেন।

আইডিআরএর হিসাবে জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রাহকদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। এই বিপুল অর্থ পরিশোধের উদ্যোগই এখন নাদিয়া নিভিনের সংস্কার কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তার অবস্থান কোম্পানি বাঁচানোর আগে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, বিমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে পলিসিধারীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, মানুষ প্রয়োজনের সময় বিমা কোম্পানির কাছ থেকে প্রতিশ্রুত অর্থ না পেলে এ খাতের প্রতি আস্থা তৈরি হবে না।

আগে গ্রাহক, পরে কোম্পানি

দীর্ঘদিন ধরে বিমা খাতে বকেয়া দাবি নিষ্পত্তি নিয়ে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। এবার সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, বিনিয়োগ ও দায় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে সম্পদ নগদায়নের পথে হাঁটছে আইডিআরএ।

চেয়ারম্যানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, ব্যাংকের এফডিআরসহ বাজারযোগ্য সম্পদ নগদায়ন করে গ্রাহকের দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫২৩ গ্রাহকের প্রায় ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা পরিশোধের মধ্য দিয়ে বকেয়া দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে। ৭ হাজার কোটি টাকার তুলনায় অঙ্কটি ছোট হলেও এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দাবি পরিশোধ এবার শুধু আলোচনার বিষয় নয়, বাস্তব কর্মসূচি।

এ বিষয়ে বিমা খাতের সংশ্লিষ্টরাও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটাতে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ) সভাপতি ও পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিএম ইউসুফ আলী বলেন, “গ্রাহকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সময়োপযোগী। দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি নিষ্পত্তি করতে হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কোম্পানিগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে বিমা খাতে আস্থা ফেরানো সম্ভব।”

‘ডাবল সার্ভার’ বন্ধে কঠোরতা

বিমা কোম্পানিগুলোর তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ‘ডাবল সার্ভার’ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে আইডিআরএ। চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দেওয়া তথ্যের বাইরে আলাদা সার্ভারে তথ্য সংরক্ষণের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, সম্পদ, দায় এবং গ্রাহকের পাওনা সম্পর্কে নিয়ন্ত্রকের কাছে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন। তাই অতিরিক্ত সার্ভার বন্ধ করে সব তথ্য একীভূত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।

নাদিয়া নিভিনের এই অবস্থানকে বিমা খাতে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ প্রকৃত তথ্য ছাড়া কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষেই কার্যকর তদারকি সম্ভব নয়।

ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা

বিমা খাতের তদারকি ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে আইডিআরএ। একটি কোম্পানি শুধু নিয়ম মানছে কি না এমন প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে তার সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ, তারল্য এবং দাবি পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। লক্ষ্য হচ্ছে কোনো প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের সংকটে পড়ার আগেই সতর্ক সংকেত শনাক্ত করা।

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ

চড়া দামে মাছ-মুরগি-ডিম, তেলেও সংকট

হঠাৎ চড়া সবজির বাজার

ফের বাড়ল সোনার দাম

চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কার্যকর হলে সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিকে শেষ মুহূর্তে উদ্ধারের পরিবর্তে আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রতিটি পলিসির আলাদা পরিচয়

গ্রাহক সুরক্ষায় ইউনিক পলিসি আইডি চালুর উদ্যোগও নিয়েছে আইডিআরএ। প্রতিটি বৈধ পলিসির জন্য স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর থাকবে এবং তা গ্রাহকের মোবাইল ফোনে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ভুয়া পলিসি, তথ্যের অসঙ্গতি এবং একই পলিসির একাধিক রেকর্ড শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক নিজের পলিসির তথ্য সরাসরি যাচাই করার সুযোগ পাবেন।

ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এমডি কাজিম উদ্দিন বলেন, “বিমা খাতে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো গ্রাহকের আস্থা। দাবি নিষ্পত্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইডিআরএ যে কাজ করছে, তা ইতিবাচক। নিয়মের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি ভালো কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করলে খাতটি আরও শক্তিশালী হবে।”

কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মেও নজর

বিমা খাতে কমিশন বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়ম নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন চেয়ারম্যান। সরাসরি কমিশনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা, অতিরিক্ত পারিশ্রমিক বা চুক্তির আড়ালে অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন নাদিয়া নিভিন। একই সঙ্গে আইডিআরএর কোনো কর্মকর্তা বা বিমা কোম্পানির কারও বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি।

বিমা কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাইয়ের উদ্যোগও নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ভুয়া বা সন্দেহজনক সনদ শনাক্তে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক ডেটাবেস ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জেনিথ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এমডি ড. নুরুজ্জামান বলেন, “বিমা খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফেরাতে নিয়ন্ত্রকের শক্ত অবস্থান প্রয়োজন। মীর নাদিয়া নিভিন গ্রাহকের স্বার্থকে সামনে রেখে যে উদ্যোগগুলো নিয়েছেন, আমরা সেগুলোকে স্বাগত জানাই। দ্রুত দাবি পরিশোধ ও তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে মানুষের আস্থা বাড়বে।”

বেইলআউট হলেও দায়মুক্তি নয়

সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর বকেয়া দাবি পরিশোধে বিশেষ সহায়তা বা বেইলআউটের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কোম্পানির দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও সামনে রেখেছে আইডিআরএ। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের ভুল ব্যবস্থাপনা বা অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত যেন গ্রাহক বা রাষ্ট্রকে বহন করতে না হয়। প্রয়োজন হলে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু এর সঙ্গে ভবিষ্যতে একই সংকট তৈরি না হওয়ার নিশ্চয়তা ও কঠোর সংস্কারের শর্ত থাকা জরুরি এমন অবস্থানই চেয়ারম্যানের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা

দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই বিমা খাতের বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিয়েছেন মীর নাদিয়া নিভিন। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই উদ্যোগগুলো কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। ৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দাবি পরিশোধ, দুর্বল কোম্পানির সম্পদ নগদায়ন, ডাবল সার্ভার বন্ধ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, ইউনিক পলিসি আইডি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রতিটি উদ্যোগই বড় ধরনের প্রশাসনিক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ।

তবে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙতে হলে কঠিন সিদ্ধান্তের বিকল্প নেই। আর সেই কঠিন সিদ্ধান্তের পথেই এখন হাঁটছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান।

বিমা খাতে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রকের সাফল্য মাপা হবে সভা-সেমিনার বা নির্দেশনার সংখ্যা দিয়ে নয়। মাপকাঠি হবে—গ্রাহক সময়মতো তার টাকা পাচ্ছেন কি না, কোম্পানির প্রকৃত তথ্য নিয়ন্ত্রকের হাতে আসছে কি না এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে বাস্তবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।

মীর নাদিয়া নিভিনের নেতৃত্বে আইডিআরএ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা একদিনে কাটবে না। তবে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে বিমা খাতে নতুন আস্থার ভিত্তি তৈরি হতে পারে। কারণ বিমা ব্যবসার মূল শক্তি শুধু পুঁজি নয় গ্রাহকের আস্থা। আর সেই আস্থা ফেরাতে এবার কথার চেয়ে কাজের হিসাবই বড়।

[atn_photocard]
আরো