পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সে নানা অনিয়মের তথ্য, নিরীক্ষায় মিলেছে গরমিল
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, এজেন্ট কমিশনে গরমিল, লাইসেন্সবিহীন এজেন্ট দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা এবং ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রিমিয়াম আয় ও রেজিস্টারে থাকা আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধানের তথ্য পাওয়া গেছে। কোম্পানিটির ২০২৪ সালের আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এসব আপত্তি তুলেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এম জেড ইসলাম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস।
নিরীক্ষকেরা কোম্পানিটির আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত কার্যক্রমে একাধিক অসংগতি চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয়, এজেন্ট কমিশন, লাইসেন্সবিহীন এজেন্ট নিয়োগ এবং প্রিমিয়াম আয়ের হিসাবে গরমিল।
২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়ন্ত্রক সীমার চেয়ে ৪০ লাখ টাকা বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স। একই সময়ে কোম্পানির নগদ প্রবাহ বিবরণীতে এজেন্ট কমিশন হিসেবে দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই অর্থকে সরাসরি আত্মসাৎ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট না হলে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যয় ও কমিশন প্রদানের বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার যাচাইয়ের বিষয়।
প্রিমিয়াম হিসাবে ৪৯ লাখ টাকার গরমিল
কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাবে রেকর্ড করা প্রিমিয়াম আয় এবং প্রিমিয়াম রেজিস্টারে থাকা আয়ের মধ্যেও ৪৯ লাখ টাকার ব্যবধান পেয়েছেন নিরীক্ষকেরা। এ বিষয়ে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি বলে নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোম্পানির মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা আর্থিক বিবরণীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৫৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। মোট বিনিয়োগ ছিল ৮৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে এফডিআরে বিনিয়োগ ছিল ৭২ কোটি ৫ লাখ টাকা।
লাইসেন্স নেই দুই এজেন্টের
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের ১৩ জন এজেন্টের মধ্যে ১১ জনের বৈধ লাইসেন্স ছিল। বাকি দুজনের কোনো লাইসেন্স ছিল না। অর্থাৎ লাইসেন্সবিহীন দুই এজেন্টের মাধ্যমেও কোম্পানিটির ব্যবসা পরিচালিত হয়েছে।
এ ছাড়া কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য থাকলেও নয়জন উন্নয়ন কর্মকর্তার (ডেভেলপমেন্ট অফিসার) বেতন দেওয়া হয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কোম্পানিটির বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
দাবি পরিশোধের হার কম
গ্রাহকের বীমা দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও কোম্পানিটির দুর্বলতার তথ্য পাওয়া গেছে। আইডিআরের প্রতিবেদনে পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সকে ঝুঁকিপূর্ণ নন-লাইফ বীমা কোম্পানির তালিকায় রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির দাবি পরিশোধের হার ছিল ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ।
তবে নন-লাইফ বীমা কোম্পানির দাবি পরিশোধের হার দিয়ে এককভাবে কোনো কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা বা ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় কি না, তা নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কারণ, দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সার্ভেয়ার প্রতিবেদন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, তদন্ত ও পুনর্বীমা চুক্তির শর্তসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় আসে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুনের একটি প্রতিবেদনে পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের মোট ২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকার দাবির মধ্যে ২৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বকেয়া থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বকেয়া দাবির হার ৯৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ বলা হয়েছে।
মুনাফায় ওঠানামা
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৪৩ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৩৩ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরে ইপিএস বেড়েছে ১০ পয়সা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নগদ কার্যকরী প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) হয়েছে ৬৬ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩২ পয়সা। ৩১ মার্চ ২০২৬ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ১৪ টাকা ৭৫ পয়সা। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ইপিএস ৪৩ পয়সায় উন্নীত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৪১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪৫ পয়সা। এ সময়ে এনওসিএফপিএস হয়েছে ১ টাকা ১ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭০ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস হয়েছে ১৫ টাকা ৫০ পয়সা।
ওয়েবসাইট হালনাগাদ নিয়েও প্রশ্ন
কোম্পানিটির ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ না করার অভিযোগও রয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে পুরোনো বিভিন্ন তথ্য ও ছবি দেখা যায়। এতে বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের জন্য হালনাগাদ তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কোম্পানিটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত থাকলেও নিয়মিত হালনাগাদের ঘাটতির বিষয়টি আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
নিরীক্ষায় উঠে আসা অনিয়মের বিষয়ে পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সুকুমার চন্দ্র রায়ের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
এ বিষয়ে আইডিআরের মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমী বলেন, “ইতিপূর্বে এসব কারণে পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সকে জরিমানা করা হয়েছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, নিয়ম মেনে ব্যবসা না করার ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অনিয়ম ও আইনের ঘাটতি তৈরি হয়। এসব তথ্য জনসমক্ষে এলে গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, আইন ও নীতিমালা অনুসরণ না করে ব্যবসা পরিচালনা করলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসা করতে চাইলে এর প্রভাব গ্রাহক ধরে রাখার ওপরও পড়তে পারে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কাছ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেয়ারবাজারে অবস্থান
১৯৯৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
কোম্পানির মোট ৫৯ কোটি ৮১ লাখ ২৫ হাজার ৬টি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে শূন্য দশমিক ০২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৪৩ দশমিক ২১ শতাংশ শেয়ার।
কোম্পানিটি বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোম্পানিটির শেয়ার ২৯ টাকা ১ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।
কোম্পানিটির ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে আর্থিক ও করপোরেট তথ্য রয়েছে।