গুলশানে ২৪ তলার অনুমোদনে ৩৪ তলা হিলটন, উচ্চতা নিয়ে বেবিচকের আপত্তি
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২-এ ২৪ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ভবনটির অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয়, অতিরিক্ত উচ্চতা এবং নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) একাধিকবার নোটিশ দিলেও নির্মাণকাজ চলমান ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। অন্যদিকে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ভবনটির উচ্চতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
ভবনটির মালিক ডা. এইচ বি এম ইকবাল। তিনি প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান, প্রিমিয়ার গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য। তবে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২৪ তলার অনুমোদন, নির্মিত ৩৪ তলা
রাজউকের সূত্র অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১৬ জুন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার নির্মাণের জন্য পাঁচটি বেজমেন্টসহ ১৫ তলা ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল সংশোধিত নকশায় ছয়টি বেজমেন্টসহ ২৪ তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে ভবনটি ৩৪ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ অনুমোদিত নকশার তুলনায় অতিরিক্ত ১০ তলা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রাজউক একাধিকবার নোটিশ দিলেও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজউকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক সাইদুল ইসলাম নিয়মবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগে হোটেল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ভবনটির বর্ধিত অংশ কেন ভেঙে ফেলা হবে না, তা জানতে চেয়েও নোটিশ দেওয়া হয়। এসব নোটিশের বিরুদ্ধে ভবনমালিক উচ্চ আদালতে রিট করেন বলে রাজউক সূত্রে জানা গেছে।
নকশার ব্যত্যয়ের বিষয়টি স্বীকার রাজউকের
রাজউকের প্রধান স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদ বলেন, ২৪ তলা ভবনের অনুমোদন নেওয়া হলেও সেখানে ৩৪ তলা নির্মাণ করা হয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পরিদর্শনে গেলে ভবনমালিক তাঁর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারসহ কয়েকটি ভবনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে রাজউকের তিনটি দল মাঠে কাজ করছে। শিগগিরই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
২১০ ফুট উচ্চতার অনুমোদন, ভবন ৩৪০–৩৫০ ফুট
ভবনটির উচ্চতা নিয়ে বেবিচকেরও আপত্তি রয়েছে। সংস্থাটির সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে হিলটন কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভবনটির সর্বোচ্চ উচ্চতা ২১০ ফুট নির্ধারণ করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষ ৩৭২ ফুট উচ্চতার অনুমোদন চেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদন করে। তবে বেবিচকের পক্ষ থেকে ২১০ ফুটের বেশি উচ্চতার অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়।
বেবিচকের একটি প্রতিনিধি দল গত ১৩ অক্টোবর ভবনটির উচ্চতা পরিমাপ করতে সরেজমিনে যায়। তাদের পরিমাপে ভবনটির উচ্চতা প্রায় ৩৪০ থেকে ৩৫০ ফুট পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অতিরিক্ত উচ্চতায় নির্মিত অংশ অপসারণের বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান ও ভবনমালিকের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গেছে।
নির্মাণকাজ বন্ধ, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা অসমাপ্ত
গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বরের কাছে হোটেল দ্য ওয়েস্টিনের পূর্ব পাশে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ভবনটি অবস্থিত। ভবনটির মূল কাঠামোর কাজ প্রায় শেষ হলেও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি বলে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরাও নির্মাণকাজ শুরুর সময় বা শেষ হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানের পাঁচতারকা হোটেলটিতে ২৫০টি বিলাসবহুল কক্ষ ও স্যুট, একটি অল-ডে ডাইনিং রেস্তোরাঁ, দুটি বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ, লবি লাউঞ্জ, রুফটপ সুইমিং পুল, স্পা, ফিটনেস সেন্টার, আধুনিক বলরুম এবং বহুতল গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকার কথা।
জমির মালিকানা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
রাজউক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হোটেলটি যে জমিতে নির্মিত হচ্ছে, সেটি একসময় রাজউকের মালিকানাধীন ছিল। ১৯৫৮ সালে এ রউফ নামের এক ব্যক্তি ১৮ কাঠা ১৫ ছটাক জমি বরাদ্দ পান। পরবর্তী সময়ে তাঁর নাতি ইফতেখার হায়াত খানের কাছ থেকে ডা. এইচ বি এম ইকবাল জমিটি কিনে ভবন নির্মাণ শুরু করেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
ভবনের জমির পরিমাণ ও অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণের বিষয়েও আপত্তি ছিল বলে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অর্থায়ন নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান
হোটেল নির্মাণের অর্থায়ন এবং ডা. এইচ বি এম ইকবালের সম্পদসংক্রান্ত বিষয়েও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইকবালের মালিকানাধীন বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও হোটেলের নির্মাণব্যয়ের অর্থায়ন নিয়ে তদন্ত চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংক ২৩০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। এর মধ্যে ব্যাংকটির বনানী শাখা থেকে ১২৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। তবে এই ঋণের সঙ্গে হিলটন হোটেল প্রকল্পের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুর মফিজ বলেছেন, হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নামে ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ দেওয়া হয়নি। ফলে হোটেল প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে অভিযোগ ও ব্যাংকের বক্তব্য পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞের প্রশ্ন, জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণের ঘটনায় রাজউকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনুমোদনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের ঘটনা নগর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা প্রকাশ করে।
ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, রাজউকের একাধিক নোটিশ, বেবিচকের উচ্চতা-সংক্রান্ত আপত্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন নজরদারিতে রয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তের ফল, আইনগত প্রক্রিয়া এবং কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ভবনটির অতিরিক্ত অংশের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভবনমালিক ডা. এইচ বি এম ইকবালের বক্তব্য জানতে প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে একাধিকবার ফোন ও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।