৩৫ কোম্পানি ছাড়া বাকী কোম্পানির ফ্লোরপ্রাইস প্রত্যাহার

দরপতন ঠেকাতে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির শেয়ারদরে যে ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন দরসীমা আরোপ করেছিল শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, তার থেকে ৩৫টি বাদে সবগুলোর ওপর থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বৃহস্পতিবার এক আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সংস্থাটি।

সাময়িক সময়ের কথা বলে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দরের ওপর ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে বিএসইসি। গতকাল জারি করা আদেশে সংস্থাটি বলেছে, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত শুধু ৩৫ কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে আগের আদেশ বহাল থাকবে। বাকি সব শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে নিয়মিত সার্কিট ব্রেকার, অর্থাৎ আগের দিনের বাজারদরের ভিত্তিতে পৌনে ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত দর ওঠানামার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। রোববার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

যে ৩৫ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হয়নি, সেগুলো হলো– আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, বারাকা পাওয়ার, বিএটি বাংলাদেশ, বেক্সিমকো লিমিটেড, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস কোম্পানি, বিএসআরএম লিমিটেড, বিএসআরএম স্টিল, কনফিডেন্স সিমেন্ট, ডিবিএইচ, ডরিন পাওয়ার, এনভয় টেক্সটাইল, গ্রামীণফোন, এইচআর টেক্সটাইল, আইডিএলসি ফাইন্যান্স, ইনডেক্স এগ্রো, ইসলামী ব্যাংক, কেডিএস এক্সেসরিজ, খুলনা পাওয়ার, কাট্টলী টেক্সটাইল, মালেক স্পিনিং, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, ন্যাশনাল হাউজিং এন্ড ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল পলিমার, ওরিয়ন ফার্মা, পদ্মা অয়েল, রেনাটা, রবি, সায়হাম কটন, শাশা ডেনিম, সোনালী পেপার, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, শাইনপুকুর সিরামিক, শাহজীবাজার পাওয়ার, সামিট পাওয়ার এবং ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনস কোম্পানি।

উল্লেখিত ৩৫ কোম্পানির মধ্যে ন্যাশনাল পলিমার ছাড়া বাকি ৩৪টি গতকাল লেনদেন শেষেও ফ্লোর প্রাইসে আটকে ছিল। শুধু ন্যাশনাল পলিমারের শেয়ার গতকালই ১ টাকা ১০ পয়সা বা ২ শতাংশ দর বেড়ে ৫২ টাকা ১০ পয়সায় কেনাবেচা হয়। ৩৫টি কোম্পানিতে ফ্লোর প্রাইস কেন রাখা হলো, তা নিয়ে বাজারে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিএসইসির এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ। সংগঠনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তারা আশা করছেন, আগামী এক বা দুই মাসের মধ্যে শেয়ারবাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে। ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যাতে কোনোভাবেই ভীতি না ছড়ায়, তার জন্য সব ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন ডিবিএ সভাপতি।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আছে ৩৫৫টি এবং তালিকাভুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড ৩৭টি। এর মধ্যে ২১৮টি গতকাল দিনের লেনদেন শেষেও ফ্লোর প্রাইসে আটকে ছিল। ফ্লোর প্রাইসের ওপরে কেনাবেচা হওয়া বাকি ১৭৪ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৪টি ফ্লোর প্রাইসের থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ এবং ২১টি ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে কেনাবেচা হয়েছে। বাকি ১১৯ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ফ্লোর প্রাইস থেকে ১০ শতাংশের ওপর কেনাবেচা হয়।

যে কারণে কিছু শেয়ারে ফ্লোর উঠল না: যে ৩৫ কোম্পানির শেয়ারদরের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হলো না, সেগুলো কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে– এমন প্রশ্নে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, কোম্পানিগুলোর ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের ভিত্তিতে বাজার মূল্যসূচকে অবদান, মার্জিনযোগ্য শেয়ারগুলোর মধ্যে বিক্রির চাপ বেশি, মূল্য-আয় অনুপাত বেশি– এমন বেশ কিছু দিক বিবেচনায় নিয়ে তালিকাটি করা হয়েছে।

বিএসইসির মুখপাত্র বলেন, এই মুহূর্তে এই ৩৫ শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস তুলে নিলে যদি দরপতন হয়, তাহলে এগুলোর শেয়ারহোল্ডাররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাছাড়া বাজার মূল্যসূচকে এসব শেয়ারের অবদান বেশি বিধায় দরপতন হলে সূচকে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে পারে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে কিছু শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে এসব শেয়ারের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেবে বিএসইসি। তবে পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে ৩৫ শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়নি, কমিশন যে ভিত্তিতে এগুলোকে আলাদা করেছে বলে দাবি করেছে, তার সঙ্গে মিল নেই।

বৃহস্পতিবার ফ্লোর প্রাইসে পড়ে থাকা শেয়ারের লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লেনদেনের প্রথমার্ধে এসব শেয়ারের বিক্রেতাশূন্য অবস্থার বিপরীতে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৪৫টি আদেশের বিপরীতে ১ হাজার ১১২ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির আদেশ ছিল। এর মধ্যে শুধু ফ্লোর প্রাইসেই শেয়ার বিক্রির আদেশ ছিল ১ হাজার ৫২ কোটি টাকার। এককভাবে ১ হাজার ৪৩৭ বিনিয়োগকারীর থেকে সর্বোচ্চ ১২৪ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির আদেশ ছিল বেক্সিমকো লিমিটেডের। বিএটির ৭০৮ বিনিয়োগকারীর থেকে পৌনে ২৮ কোটি টাকার, ওরিয়ন ফার্মার ৬৪২ বিনিয়োগকারীর ২৬ কোটি টাকার, ফরচুনের ৬১৪ বিনিয়োগকারীর ২৬ কোটি টাকার, সোনালী পেপারের ৪০০ বিনিয়োগকারীর ২৫ কোটি টাকার, গ্রামীণফোনের ৩২৯ বিনিয়োগকারীর সাড়ে ২৩ কোটি টাকার এবং বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস কোম্পানির ২২১ বিনিয়োগকারীর প্রায় ২৩ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির আদেশ ছিল। যে ৩৫ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে, সূচকে তাদের অবদান ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে শীর্ষ ১৫টির অবদান সাড়ে ২৩ শতাংশ। কাট্টলী টেক্সটাইল, ন্যাশনাল পলিমার, ইনডেক্স এগ্রোসহ বাকি ২০ শেয়ারের সূচকে অংশ মাত্র পৌনে ৪ শতাংশ।

কমিশন সভার সিদ্ধান্ত নয়

তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারদরে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সংস্থাটির কমিশন সভায় হয়নি। সংস্থার শীর্ষ ও ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান, ফ্লোর প্রাইস আরোপের সময়ও কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনকি প্রত্যাহারের বিষয়ে কমিশন সভায় কোনো আলোচনা হয়নি। কমিশন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিলেন। প্রত্যাহারও করেছেন তিনি। আইনে কমিশনের চেয়ারম্যানকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হলেও বিএসইসির প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম-সংক্রান্ত ১৯৬৯ সালের অধ্যাদেশ এবং ১৯৯৩ সালের আইনে কমিশন সভা ছাড়া কোনো প্রকার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা চেয়ারম্যানকে দেওয়া হয়নি।

ইকোনোমিপোস্ট /এমআর

আরো