ব্যাংকাসুরেন্স নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে গার্ডিয়ান লাইফ, শঙ্কায় নতুন উদ্যোগ
বিমা খাত পুনরুদ্ধারে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে চালু হওয়া ব্যাংকাসুরেন্স ব্যবস্থা নানা অনিয়মের অভিযোগে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আগ্রাসী ও নীতিবহির্ভূত কার্যক্রম এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।
ব্যাংকাসুরেন্স নীতিমালা অনুযায়ী একটি বিমা কোম্পানি সর্বোচ্চ তিনটি ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করতে পারবে, কমিশন হার সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ হবে এবং ব্যাংকের বাইরে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা বা প্রণোদনা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, এসব শর্ত উপেক্ষা করেই গার্ডিয়ান লাইফ ব্যাংকাসুরেন্স কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ব্যাংকের ভেতরে বিমা কোম্পানির কর্মকর্তা বসানোর অভিযোগ
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকাসুরেন্সের মূল দর্শন হলো—ব্যাংক কর্মকর্তারাই গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি বিমা পণ্যের বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। অথচ অভিযোগ রয়েছে, গার্ডিয়ান লাইফ তাদের নিজস্ব কর্মকর্তা ও সেলস স্টাফদের ব্যাংকের ভেতরে বসিয়ে সরাসরি পলিসি বিক্রি করছে, যা নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
ব্যাংকিং সূত্র জানায়, নির্ধারিত কমিশনের বাইরেও ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নগদ অর্থ, মূল্যবান উপহার, স্মার্টফোন, মোটরসাইকেল এমনকি বিদেশ ভ্রমণের প্রলোভন দেখিয়ে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির পণ্য বিক্রিতে উৎসাহিত করার তথ্যও সামনে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের অসম প্রতিযোগিতা ব্যাংকাসুরেন্স ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নষ্ট করছে এবং নিয়ম মেনে চলা অন্যান্য বিমা কোম্পানিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে এতে গ্রাহকদের জন্য নিরপেক্ষ পরামর্শ পাওয়ার সুযোগও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
সিইও নিয়োগে অনিয়ম, জরিমানা করেছে আইডিআরএ
ব্যাংকাসুরেন্স ছাড়াও গার্ডিয়ান লাইফের বিরুদ্ধে নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করেছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগে বিধি লঙ্ঘনের দায়ে।
আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রায় চার বছর ধরে কোম্পানিটি সিইও ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল, যা বিমা আইন-২০১০ এর ৮০ ধারা লঙ্ঘন। এ কারণে বিমা আইন-২০১০ এর ১৩০(খ) ধারা অনুযায়ী আইডিআরএ’র ১৭৮তম সভায় জরিমানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে বিধি অনুযায়ী সিইও নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়োগ না হলে পুনরায় জরিমানার কথাও জানানো হয়েছে।
এছাড়া, কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ার বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে আইন অমান্য করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালে কার্যক্রম শুরু করলেও এখনও তালিকাভুক্ত না হওয়ায় প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা প্রযোজ্য হচ্ছে, যা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
কিছু খাতসংশ্লিষ্টের অভিযোগ, আইডিআরএ ছোট কিছু বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিলেও গার্ডিয়ান লাইফের বিষয়ে তুলনামূলক নমনীয় আচরণ করছে। এতে বিমা খাতে “অনিয়মই নিয়ম”—এমন একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে আইডিআরএ’র একজন কর্মকর্তা বলেন, “বিমা খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
গার্ডিয়ান লাইফের বক্তব্য
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চলতি দায়িত্বে থাকা সিইও শেখ রাকিবুল করিম বলেন, “আমরা আইডিআরএ নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করিনি।” বিধিবহির্ভূত প্রণোদনার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “অন্যান্য অনেক কোম্পানিও বিভিন্ন ধরনের অফার দেয়। শুধু গার্ডিয়ানের নামই কেন আসছে? মূল বিষয় হলো—আমরা আইডিআরএ’র নির্ধারিত লিমিট ক্রস করিনি।”
আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
বিমা খাতের বিশ্লেষকদের মতে, অনুমোদনহীন ব্যবস্থাপনা ও আগ্রাসী বিপণন কৌশল অব্যাহত থাকলে ব্যাংকাসুরেন্সের মতো একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ বাংলাদেশে নৈতিক সংকটে পড়ে ব্যর্থ হতে পারে। তারা মনে করেন, এখনই বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইডিআরএ’র সমন্বিত ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকাসুরেন্স ব্যবস্থার ভবিষ্যৎই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।