লুব-রেফের সম্পদের আড়ালে আইপিও’র শত কোটি টাকা গায়েব
শেয়ারবাজারে ভালো ব্যবসা ও শক্ত আর্থিক ভিত্তির চিত্র তুলে ধরে প্রিমিয়ামে আইপিও এনে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল লুব-রেফ বাংলাদেশ লিমিটেড। তবে সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেখানো সম্পদ ও প্রকল্প ব্যয়ের বড় একটি অংশ বাস্তবভিত্তিক নয়। ভুয়া সম্পদ ও প্রকল্প ব্যয়ের আড়ালে আইপিও’র প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
২০২১ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসে লুব-রেফ। বিতর্কিত ইস্যু ম্যানেজার এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে কোম্পানিটি প্রিমিয়ামসহ আইপিও থেকে অর্থ তোলে। প্রসপেক্টাসে জানানো হয়, উত্তোলিত অর্থের বড় অংশ যন্ত্রপাতি কেনা, জমি উন্নয়ন ও নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থের সিংহভাগই কাগুজে হিসাবেই সীমাবদ্ধ ছিল।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত লুব-রেফ তাদের স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছে ৫৮৪ কোটি টাকার বেশি। অথচ সরেজমিনে যাচাইয়ে নিরীক্ষকরা প্রায় ১১৫ কোটি টাকার সম্পদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। একইভাবে আইপিও অর্থে চলমান প্রকল্প দেখিয়ে ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস হিসেবে দেখানো ২১২ কোটি টাকার ক্ষেত্রেও বাস্তব কোনো নির্মাণকাজ বা অগ্রগতি পাওয়া যায়নি।
নিরীক্ষকরা জানান, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ প্রকল্প ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় বুকস অব অ্যাকাউন্টস, সাপোর্টিং ডকুমেন্ট কিংবা লেজার সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেখানো সম্পদ ও ব্যয়ের সত্যতা যাচাই সম্ভব হয়নি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ ধরনের তথ্যকে আর্থিক প্রতিবেদনের গুরুতর অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লুব-রেফের পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন রুবাইয়া নাহার এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তার স্বামী মোহাম্মদ ইউসুফ। অভিযোগ রয়েছে, পরিচালকদের একটি চক্র আইপিও’র অর্থ ভুয়া সম্পদ কেনা ও প্রকল্প ব্যয়ের নামে তুলে নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট কেনা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।
এদিকে আইপিও থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ এখনো অব্যবহৃত অবস্থায় একটি সংকটাপন্ন ব্যাংকে পড়ে থাকায় ওই অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার না করাকে প্রসপেক্টাস লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষকরা।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় প্রিমিয়ামে শেয়ার বিক্রি করা লুব-রেফ বর্তমানে ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে। সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোতে শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়েছে এবং ঘোষিত লভ্যাংশও সময়মতো বিতরণ করতে পারেনি কোম্পানিটি। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
লুব-রেফের অনিয়ম প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) জানিয়েছে, আইপিও ফান্ড ব্যবহারে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।