প্রিমিয়ার ব্যাংকে সংঘবদ্ধ জালিয়াতি, উধাও ৩ হাজার কোটি টাকা

ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে মিলেমিশে প্রিমিয়ার ব্যাংক-এর ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হরিলুট করেছেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল, তার দুই ছেলে সাবেক পরিচালক মঈন ইকবাল ও ইমরান ইকবাল, কয়েকজন সাবেক পরিচালক এবং একাধিক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা। আর এসব অনিয়মে জড়িত ছিলেন তৎকালীন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও।

ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের জেনারেল সার্ভিসেস ডিভিশন, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন এবং বনানী শাখার সঙ্গে জড়িত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তকালে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

এইচ বি এম ইকবাল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর একজন প্রভাবশালী নেতা এবং তিনি দলটির সাবেক সংসদ সদস্যও ছিলেন। ১৯৯৯ সালে প্রিমিয়ার ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে টানা ২৬ বছর ব্যাংকটি তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছাড়ার পর ইকবালও দেশ ছাড়েন। এরপর ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট প্রিমিয়ার ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অডিট ও তদন্ত প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ ব্যাংক বোর্ড পুনর্গঠন করে সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল, তার দুই ছেলে ও ব্যাংকটির অন্যান্য সাবেক পরিচালকদের অনিয়ম তদন্তে নিয়োগ দেওয়া হয় ছয়টি অডিট ফার্ম। আর ফরেনসিক নিরীক্ষাটি পরিচালনা করেছে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনারস।

২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর বর্তমান বোর্ডের অনুমোদিত একটি তদন্ত কমিটি এই নিরীক্ষার ব্যবস্থা করে। তদন্ত কমিটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রিমিয়ার ব্যাংক সম্প্রতি আত্মসাৎ হওয়া অর্থ ফেরত পেতে একাধিক মামলা করেছে।

মোট আত্মসাতের পরিমাণ

ফরেনসিক অডিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে মোট ৩ হাজার ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত অফিস ভাড়া দেখানো, সিএসআর তহবিলের অপব্যবহার, খতিয়ানে কারসাজি, ক্রয় প্রক্রিয়ার অপব্যবহার এবং ভুয়া সংস্কার ব্যয় দেখানোর মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দায়ের করা মামলা

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া এক চিঠিতে ব্যাংকটি জানায়, প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের নামে অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগে গত ১১ মার্চ ৩৫ কোটি টাকার একটি মামলা করা হয়েছে।

এছাড়া গত ১৫ মার্চ আরও দুটি আলাদা মামলা করা হয়। এসব মামলায় অফিস ভাড়া ও সরবরাহকারীদের (ভেন্ডর) নামে আত্মসাৎ করা মোট ৩ হাজার ৫৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ফেরত চাওয়া হয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন এইচ বি এম ইকবাল, তার ছেলে ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মঈন ইকবাল, সাবেক পরিচালক, সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাসহ আরও অনেকে।

অতিরিক্ত ভাড়া ও আর্থিক ক্ষতি

নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইকবাল ও তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ভাড়াটিয়া প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত ভাড়ায় চুক্তি এবং নবায়নের মাধ্যমে ৪০৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকার বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

ব্যাংকটি বাজারদরের তুলনায় বেশি ভাড়া পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি বেশি সার্ভিস চার্জ, ২ থেকে ৩ বছরের আগাম ভাড়া, বাড়তি টাকার ওপর ভ্যাট এবং অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়েছে। এমনকি অফিসের অনেক জায়গা ঠিকমতো ব্যবহারও করা হয়নি, যা ব্যবসায়িকভাবে যৌক্তিক নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এইচ বি এম ইকবাল চেয়ারম্যান থাকাকালে নিজের মালিকানাধীন ইকবাল সেন্টারের জন্য প্রতি বর্গফুট ৩৫০ থেকে ৫০৬ টাকা ভাড়া নেন, যেখানে বাজারদর ছিল ১২০ থেকে ১৬০ টাকা।

এখানে পরিকল্পিতভাবে ব্যাংকের টাকা নেওয়া হয়েছে, ফলে ব্যাংকের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৭১৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

সিএসআর ও অন্যান্য খাতে অনিয়ম

প্রতিবেদন বলছে, সিএসআর, প্রচারণা, বিজ্ঞাপন, বিনোদন, ব্যবসা উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের মাধ্যমে ১২৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সঠিক নিয়ম মেনে এসব খরচ করা হয়নি। দরপত্র নেই, ভাউচার অসম্পূর্ণ, নথি নেই, ব্যবহারের রিপোর্ট নেই, এমনকি সঠিকভাবে যাচাইও করা হয়নি। কিছু টাকা তাদের পরিবার বা পরিচিতদের কাছে চলে গেছে বা ব্যাংকের কোনো কাজে আসেনি।

১২৮ কোটি টাকার সিএসআর খরচের মধ্যে কম্বল, ত্রাণ ও দানের জন্য হিসাব করা হয়েছিল, যার বড় অংশ আংশিকভাবে বা একেবারেই বিতরণ হয়নি। পাঁচ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের মধ্যে পাঁচটি ভেন্ডর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ৭৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।

প্রিন্টিং ও স্টেশনারি খাতে অনিয়ম

তথ্যানুযায়ী, ক্যালেন্ডার ও বার্ষিক প্রতিবেদনের জন্য প্রিন্টিং ও স্টেশনারিতে ১২৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। কিন্তু এখানে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করা হয়।

নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ কোটি ৬২ লাখ টাকা কালার ওয়েবকে বেশি দাম ও বেশি পরিমাণে দেওয়া হয়।

বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি খাতে অনিয়ম

এছাড়া, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর খুলনা টাইগার্সের ফ্র্যাঞ্চাইজি খরচে ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।

যেখানে প্রকৃত খরচ ছিল ৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-এ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা চুক্তির ফাঁকফোকর দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়।

অন্যান্য খাতে অনিয়ম

নিরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, ওই সময়ের মধ্যে অফিসের ইন্টেরিয়র, সংস্কার, নির্মাণ, ব্যবসা উন্নয়ন, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন, ভেন্ডরকে অগ্রিম টাকা দেওয়া এবং ভবনের মেরামতের খরচের নামে কোটি কোটি টাকা বেআইনিভাবে বা অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের লুটপাটের বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। টাকা আদায়ের জন্য যা করা দরকার ব্যাংক করবে। প্রথমে টাকাগুলো ফেরত আনার চেষ্টা করবে। না দিলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে

আরো