গ্রাহকের ৫২ কোটি টাকা গেল কোথায়?

বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিরাপদে সংরক্ষণের কথা ছিল সমন্বিত গ্রাহক ব্যাংক হিসাবে (সিসিবিএ)। কিন্তু সেই হিসাবেই মিলছে না ৫২ কোটি টাকা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিদর্শনে এই ঘাটতি ধরা পড়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এনআরবিসি সিকিউরিটিজ কি গ্রাহকদের অর্থ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ব্যবহার করেছে?

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিদর্শন, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার তথ্য বিশ্লেষণে এমন একটি আর্থিক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে একই সময়ে বেড়েছে গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি, ব্যাংকঋণের চাপ, নেগেটিভ ইকুইটি ও লোকসান। যদিও গ্রাহকদের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। পুরো বিষয়টি তদন্ত করছে বিএসইসি।

ঘটনার সূত্রপাত চলতি মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিদর্শনে। সেখানে এনআরবিসি সিকিউরিটিজের সমন্বিত গ্রাহক ব্যাংক হিসাবে ৫২ কোটি টাকার ঘাটতি ধরা পড়ে। পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটি মূল কোম্পানি এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ৫৫ কোটি টাকা এনে ঘাটতি পূরণ হয়েছে বলে ডিএসইকে জানায়।

কিন্তু পরদিন বিএসইসির আকস্মিক পরিদর্শনে দেখা যায়, আগের দিন জমা দেওয়া সেই অর্থ আবার ব্যাংকে ফেরত চলে গেছে। ফলে কার্যত গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি আগের অবস্থাতেই রয়ে যায়। এই ঘটনাই তদন্তের কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

এনআরবিসি সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল গফুর রানা অবশ্য দাবি করেছেন, বর্তমানে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে কোনো ঘাটতি নেই। মূল প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সেই অর্থ ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে, নাকি অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় এসেছে—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেননি তিনি। তাঁর ভাষ্য, মূল কোম্পানি প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন উপায়ে আর্থিক সহায়তা দিতে পারে।

তবে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বলছে, ২০২৫ সালের শেষে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে এনআরবিসি সিকিউরিটিজের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা মূল প্রতিষ্ঠান এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের। বাকি ঋণ রয়েছে সিটি, মার্কেন্টাইল ও মেঘনা ব্যাংকে। ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে নেওয়া এসব ঋণের বিপরীতে বছরে প্রায় ২৬ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হয়।

মূল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই ১৩ শতাংশ সুদে ১০৯ কোটি টাকার টার্ম লোন সুবিধা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে নগদ অর্থের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধও বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সময়েই মার্জিন ঋণেও বড় ধরনের সংকটে পড়ে এনআরবিসি সিকিউরিটিজ। ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো মার্জিন ঋণ নেগেটিভ ইকুইটিতে না গেলেও ২০২৫ সালে ২০৩ কোটি টাকার মার্জিন ঋণের মধ্যে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা নেগেটিভ ইকুইটিতে পরিণত হয়। এর বিপরীতে প্রায় ১৬ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে।

ফলে মার্জিন ঋণ থেকে সুদ আয় এক বছরে ৩৬ কোটি টাকা থেকে কমে ২১ কোটি টাকায় নেমে আসে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে নিজস্ব বিনিয়োগেও লোকসান বাড়ে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০ কোটি ১১ লাখ টাকার নিট লোকসান করে।

এই আর্থিক চাপের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধ, তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং কিছু গ্রাহককে মার্জিন ঋণ দিতে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবের অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোন গ্রাহকের অর্থ কোথায় ব্যবহার হয়েছে বা কোন ব্যাংকের দায় পরিশোধে কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ নথি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেখাতে পারেননি। স্বাধীনভাবে অভিযোগটির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। ফলে বিষয়টির সত্যতা নির্ধারণ এখন পুরোপুরি বিএসইসির তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।

বিএসইসি সূত্র বলছে, এনআরবিসি সিকিউরিটিজে সমন্বিত গ্রাহক ব্যাংক হিসাবে (সিসিবিএ) ঘাটতির সমস্যা নতুন নয়। গত বছরের নভেম্বরে প্রায় ৯ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্ত হয়েছিল। সর্বশেষ পরিদর্শনে সেই ঘাটতি বেড়ে ৫২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে মাত্র আট মাসে ঘাটতি প্রায় ছয় গুণ বেড়ে যাওয়ার কারণ খুঁজছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ কিছু গ্রাহক পর্যাপ্ত অর্থ জমা না দিয়েই শেয়ার কেনাবেচা করতেন। বিএসইসি অভিযোগ পেয়েছে, এসব লেনদেনের অর্থের একটি অংশ সমন্বিত গ্রাহক ব্যাংক হিসাব থেকেই জোগান দেওয়া হয়েছিল। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাবেক পরিচালকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঢাকা স্ট্রিট জার্নালও স্বাধীনভাবে অভিযোগটির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

অন্যদিকে, এনআরবিসি সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল গফুর রানা দাবি করেছেন, ২০২৫ সালে নেগেটিভ ইকুইটিতে পরিণত হওয়া প্রায় ৫৫ কোটি টাকার মার্জিন ঋণের সঙ্গে ব্যাংকের সাবেক কোনো পরিচালকের সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালে শেয়ারবাজারে তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা কমে ৩১ কোটিতে এবং ২০২৫ সালে ১১ কোটির নিচে নেমে আসে। ধারাবাহিক বাজার মন্দায় দুই বছরেই এই বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য লোকসান হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেও লোকসান অব্যাহত থাকলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন মুনাফায় ফিরেছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে ঋণের সুদ, নেগেটিভ ইকুইটির বিপরীতে প্রভিশন এবং মূলধন সংকটের কারণে আর্থিক চাপ এখনো কাটেনি।

পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, সমন্বিত গ্রাহক ব্যাংক হিসাবের অর্থ কেবল গ্রাহকদের অর্থ সংরক্ষণ এবং লেনদেন নিষ্পত্তির কাজে ব্যবহার করা যায়। গ্রাহকের লিখিত অনুমতি ছাড়া এই অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ঋণ, সুদ, পরিচালন ব্যয় বা অন্য কোনো করপোরেট দায় পরিশোধের সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রতিদিন গ্রাহকদের প্রকৃত পাওনার সমপরিমাণ অর্থ সিসিবিএতে সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে গ্রাহকদের অর্থ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের ঋণ, সুদ বা অন্য কোনো করপোরেট দায় পরিশোধ করা হয়েছে, তাহলে তা শুধু বিএসইসির নির্দেশিকা লঙ্ঘন নয়, বিনিয়োগকারীদের অর্থের গুরুতর অপব্যবহার হিসেবেও বিবেচিত হবে। সে ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানা, মূলধন পুনঃস্থাপনের নির্দেশ, পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, এমনকি ব্রোকারেজের কার্যক্রম স্থগিত বা লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।

বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে ঘাটতির বিষয়টি কমিশনের নজরে রয়েছে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে চারটি প্রশ্ন—মাত্র আট মাসে গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি ৯ কোটি টাকা থেকে ৫২ কোটিতে কীভাবে পৌঁছাল, সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার হয়েছে, ব্যাংকঋণ ও সুদ পরিশোধে ওই অর্থের কোনো ভূমিকা ছিল কি না এবং একদিনের জন্য ৫৫ কোটি টাকা এনে ঘাটতি পূরণ দেখানোর পর তা আবার কেন সরিয়ে নেওয়া হলো। এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, এটি শুধু একটি তারল্য সংকটের ঘটনা, নাকি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় আরও গভীর অনিয়মের প্রতিফলন।

আরো