লঙ্কাবাংলায় ৪২৬ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি
খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণেও রয়েছে ৪২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঘাটতি। এর সঙ্গে আছে বৈদেশিক মুদ্রার ঋণে ৪৯ কোটি টাকার বেশি অনাদায়ী লোকসান। এসব অর্থের পুরোটা ২০২৪ সালের আর্থিক হিসাবে ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়নি। ফলে ওই বছর মুনাফা দেখাতে পেরেছে দেশের অন্যতম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স পিএলসি।
প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
লঙ্কাবাংলা গ্রুপ ২০২৪ সালে ২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে। তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রভিশন ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার লোকসানসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাবসংক্রান্ত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এসব কারণে প্রকাশিত মুনাফার মান ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
৪২৬ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি
লঙ্কাবাংলার আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে ঋণ, লিজ ও অন্যান্য খাতের জন্য মোট ৭৮৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা প্রভিশন প্রয়োজন ছিল। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি সংরক্ষণ করেছে ৩৬৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর একটি চিঠির মাধ্যমে এই ঘাটতি রেখে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার অনুমতি দেয়। অর্থাৎ ২০২৪ সালের হিসাব চূড়ান্ত করার সময় পুরো প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়নি।
প্রভিশনের পুরো অর্থ ২০২৪ সালের ব্যয় হিসেবে স্বীকৃতি পেলে প্রতিষ্ঠানটির ওই বছরের মুনাফার চিত্র বড়ভাবে বদলে যেত। একটি প্রকাশিত বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ৪২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রভিশন হিসেবে ধরা হলে শেয়ারপ্রতি ফলাফল ৭ টাকা ৪১ পয়সা লোকসানে নেমে আসত।
খেলাপি ঋণে বড় ধাক্কা
লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সের ঋণের গুণগত মানে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। ২০২৩ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ২০২৪ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৮৭ কোটি ৪ লাখ টাকা।
এতে মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হারও ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশে উঠেছে। এককভাবে মূল কোম্পানি লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার আরও বেশি, ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে ঋণ আদায় ও ভবিষ্যতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মূল ব্যবসার মুনাফা কমেছে ৫৫ শতাংশ
এদিকে লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সের মূল ব্যবসার মুনাফাও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৩ সালে মূল কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল ১৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে মুনাফা কমেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ।
গ্রুপ পর্যায়ে লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজসহ সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় থাকায় সম্মিলিতভাবে মুনাফা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে মূল আর্থিক ব্যবসার মুনাফা কমে যাওয়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
মুনাফা থাকলেও লভ্যাংশ নেই
২০২৪ সালে মুনাফা দেখালেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেনি লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদ। কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভার নোটিশেও ২০২৪ সালের জন্য কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার সুপারিশের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ হিসাবের খাতায় মুনাফা থাকলেও সেই মুনাফা থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ দেওয়ার অবস্থানে ছিল না প্রতিষ্ঠানটি।