সন্ধানী লাইফে কোটি টাকার প্রিমিয়াম কেলেঙ্কারি
গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্রিমিয়ামের পৌনে ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন দেশের অন্যতম পুরোনো বীমা প্রতিষ্ঠান সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীরা। একই সঙ্গে বীমা ব্যবসার বাইরে গিয়ে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাস্তা নির্মাণের কাজে অর্থ বিনিয়োগ করে বড় অঙ্কের লোকসানও গুনেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানিটির ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন ও ব্যালান্সশিট পর্যালোচনায় এসব অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রিমিয়ামের পৌনে ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ
সন্ধানী লাইফের বার্ষিক প্রতিবেদনের ১৫৯ নম্বর পৃষ্ঠার (নোট ১৯.১.১) তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীরা গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রিমিয়াম বাবদ ৪ কোটি ৬৯ লাখ ৩৬ হাজার ২৭৬ টাকা সংগ্রহ করেন। তবে ওই অর্থ কোম্পানির তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আত্মসাৎ করা এই অর্থকে ‘Unsettle PR’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিমাই কুমার সাহা। তিনি বলেন, টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
রাস্তা নির্মাণে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ টাকা লোকসান
সন্ধানী লাইফের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘সন্ধানী লাইফ হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড’ ‘এম.এ.এইচ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’-এর হয়ে রাস্তা নির্মাণের ঠিকাদারি কাজ করেছিল।
নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনের নোট ২৮.০২ ও ১৬.০০-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই কাজ বাবদ এম.এ.এইচ কনস্ট্রাকশনের কাছে সন্ধানী লাইফ হাউজিংয়ের মোট পাওনা ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ ৫২ হাজার ৩৪৪ টাকা। দীর্ঘ সময়েও ওই অর্থ উদ্ধার না হওয়ায় গত ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ এম.এ.এইচ কনস্ট্রাকশন এক চিঠিতে পাওনা পরিশোধে নিজেদের অক্ষমতার কথা জানায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় সন্ধানী লাইফ হাউজিং ওই পাওনার মধ্যে ৫০ লাখ ৫২ হাজার ৩৪৪ টাকা ‘মন্দ ঋণ’ (Bad Debt Written Off) হিসেবে ঘোষণা করে হিসাব থেকে বাদ দেয়।
বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল কোম্পানির তহবিল সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে তা দিয়ে রাস্তা নির্মাণের মতো বীমাবহির্ভূত কাজে ব্যবহার এবং পরে এর একটি অংশ মন্দ ঋণ হিসেবে বাদ দেওয়া আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
এক বছরেই জমানো মুনাফায় ধস
এসব অনিয়মের পাশাপাশি কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে। ব্যালান্সশিটের (পৃষ্ঠা ১২১) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কোম্পানিটির সংরক্ষিত আয় (Retained Earnings) ছিল ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২০২৪ সাল শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ কোটি ৯০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির সংরক্ষিত আয় কমেছে প্রায় ৮৫ শতাংশ।
একই সময়ে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড বা জীবন বীমা তহবিলও কমেছে। ২০২৩ সালে লাইফ ফান্ড ছিল ৭০৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা ১৫.৪ কোটি টাকা কমে ৬৯৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। তবে ২০২৫ সাল শেষে হয়েছে ৭০৭ কোটি টাকা।
ঝুলে আছে ৮৪ কোটি টাকার আয়কর মামলা
কোম্পানিটির ওপর রয়েছে বড় অঙ্কের আয়কর–সংক্রান্ত দায়। বার্ষিক প্রতিবেদনের নোট ১৩.০০ অনুযায়ী, আয়কর নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। এ বাবদ কোম্পানিকে ৮৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা প্রভিশন বা সম্ভাব্য দায় হিসেবে রাখতে হয়েছে।
মামলায় কোম্পানির বিপক্ষে রায় হলে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যা প্রতিষ্ঠানটির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বীমা খাত–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকের প্রিমিয়ামের অর্থের ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নজরদারি ও তদন্ত প্রয়োজন।