‘বিমা পলিসি তামাদি’র শীর্ষে সোনালী লাইফ
বিমা খাতের ‘ক্যান্সার’ খ্যাত ‘পলিসি তামাদিতে’ শীর্ষ স্থানে রয়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে, কোম্পানিটির বকেয়া আদায়ের ১১০ কোটি টাকা নিয়েও ওঠেছে প্রশ্ন। এছাড়া সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানির অতীতে অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও সুশাসনের ব্যত্যয়েরও অভিযোগ রয়েছে।
দেশের বিমা খাতে ব্যবসা পরিচালনা করা ৩৫টি জীবন বিমা কোম্পানির ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইডিআরএ। সংস্থাটির ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তিন মাসে বিমা পলিসি তামাদি বা বন্ধ করেছেন ৩ লাখ ২৫ হাজার ২শ’ ৬৬ জন গ্রাহক। বিমা পলিসি বন্ধের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন এই তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির পলিসি তামাদি হয়েছে ৭৩ হাজার ২শ’ ৬৭টি। একই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
এসব বিষয়ে জানতে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রফিকুল ইসলামকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের জুন প্রান্তিকে পলিসি তামাদিতে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ডেলটা লাইফ। এই কোম্পানির তামাদি পলিসির সংখ্যা ২৭ হাজার ৩৭৬টি। তামাদিতে এরপরেই রয়েছে মেটলাইফ বাংলাদেশ। বিদেশি এই কোম্পানির পলিসি তামাদি হয়েছে ২০ হাজার ২৭৮টি।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে আকিজ তাকাফুল লাইফের ২ হাজার ৬৯২টি, আলফা ইসলামী লাইফের ১৩ হাজার ৩শ’ ৫৭টি, আস্থা লাইফের ১ হাজার ৪শ’ ৯০টি, বায়রা লাইফের ৪শ’ ২১টি, বেঙ্গল ইসলামি লাইফের ৭ হাজার ৭শ’ ১৯টি, বেস্ট লাইফের ১ হাজার ৫শ’ ৮০টি, চার্টার্ড লাইফের ৪ হাজার ১শ’ ৭৫টি, ডায়মন্ড লাইফের ৬শ’ ৫৮টি, ফারইস্ট লাইফের ৮শ’ ৩৬টি, গোল্ডেন লাইফের ৬ হাজার ৭শ’ ৬৮টি, গার্ডিয়ান লাইফের ৭ হাজার ৬৮টি, হোমল্যান্ড লাইফের ২ হাজার ৩শ’ ২৭টি, যমুনা লাইফের ১শ’ ৪০টি, জীবন বীমা কর্পোরেশনের ৩ হাজার ৮শ’ ৭৫টি, এলআইসি বাংলাদেশের ৪শ’ ৭টি, মেঘনা লাইফের ৪ হাজার ৩শ’ ১৪টি, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফের ৪ হাজার ৮শ’ ৮৮টি, এনআরবি ইসলামিক লাইফের ৫ হাজার ৪শ’ ২টি, পদ্মা ইসলামি লাইফের ১ হাজার ৭৫টি, পপুলার লাইফের ১৭ হাজার ৩শ’ ৪৮টি, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৮ হাজার ৯শ’ ৮টি, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১ হাজার ৬শ’ ২১টি, প্রোগ্রেসিভ লাইফের ৩ হাজার ৪৭টি, প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফের ১ হাজার ১০টি, রূপালী লাইফের ১০ হাজার ৬১২টি, সন্ধানী লাইফের ২ হাজার ৭৯৮টি, শান্তা লাইফের ৯টি, সানলাইফের ১ হাজার ৩০টি, স্বদেশ লাইফের ১৬ হাজার ৬শ‘ ২৫টি, ট্রাস্ট ইসলামি লাইফের ৫ হাজার ১শ’ ৯টি এবং জেনিথ ইসলামী লাইফের ১ হাজার ২শ’ ৭৩টি পলিসি তামাদি হয়েছে।
বিমা পলিসি তামাদি কি?
‘তামাদি’ একটি আরবি শব্দ, এর আভিধানিক অর্থ কোনো কিছু বিলুপ্ত হওয়া কিংবা বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। বিমা পলিসি তামাদি মানে হলো, যখন বিমা গ্রাহক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রিমিয়াম (বিমার কিস্তি) জমা দিতে ব্যর্থ হন, তখন পলিসিটি অকার্যকর হয়ে যায় এবং এর অধীনে থাকা জীবন বিমার সুরক্ষা ও সঞ্চয়ের সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে গ্রাহকের জমাকৃত টাকাও ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না বা কমে যায়, যা বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। আর এই তামাদির মাধ্যমে এই সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স গ্রাহকের ক্ষতি করার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে।
বকেয়া ১১০ কোটি টাকার হিসেব নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ২০২৪ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রায় ১১০ কোটি টাকা বকেয়া হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই বকেয়া অর্থের আগের হিসাব বছরেও আদায়ের জন্য অপেক্ষমান দেখানো হয়েছিল। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ, এই বড় অংকের বকেয়ার মধ্যে কার কাছে কত টাকা পাবে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে যথাযথ তথ্যের অভাবে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ফেমস অ্যান্ড আর, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসও এই বকেয়ার সত্যতা যাচাইয়ে ব্যর্থ হয়েছে। গেল ১৭ ডিসেম্বর দেশের প্রধান পুজিঁবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিষয়ে এমন মতামত জানিয়েছে নিরীক্ষক।
নিরীক্ষক তার মতামতে জানিয়েছেন, ২০২৪ হিসাব বছরে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ অগ্রিম, আমানত ও ঋণ হিসেবে ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা দিয়েছে। এর মধ্যে বকেয়া ১০৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ফেরতযোগ্য। আগের হিসাব বছরে কোম্পানিটি অগ্রিম, আমানত ও ঋণ হিসেবে ১৪৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিতরণ দেখিয়েছিলো। যার মধ্যে বকেয়া ১০৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ফেরতযোগ্য দেখানো হয়েছিল। নিরীক্ষক জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে এ পাওনা অর্থের যথার্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির আশ্রয়ের দায়ে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রয়াত চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসসহ আটজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আদালত। দুদকের সূত্রে জানা যায়, তাদের বিরুদ্ধে একে অপরের সহায়তায় প্রতারণা ও জালজালিয়াতির আশ্রয়ে জাল চুক্তিনামা তৈরি করে বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের তহবিল থেকে মোট ১৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৬ টাকা উত্তোলন করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন লেয়ারিং এর মাধ্যমে উক্ত অর্থ তাদের নামীয় বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪ (২) ও (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগে দুদকে মামলা করা হয়েছে।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আরও ব্যক্তিরা হলেন- পরিচালক ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া, মোস্তফা কামরুস সোবহান, শাফিয়া সোবহান চৌধুরী, তাসনিয়া কামরুন অনিকা, ফজলুতুননেসা, নূর-ই-হাফজা ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মীর যাশেম বিন আমান। এসব বিষয়ে কথা বলতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমীকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।