কোটি টাকা দিয়ে প্রশাসনকে প্রভাবিত করার অভিযোগ জিপিএইচ ইস্পাতের বিরুদ্ধে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মছজিদ্দা গ্রামে জলাবদ্ধতা যেন এখন স্থায়ী অভিশাপ। একদিনের বৃষ্টিতেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায় পুরো এলাকা, আর সেই পানি থেকে মুক্তি মিলতে সময় লাগে এক মাসেরও বেশি। অভিযোগ উঠেছে, বছরের পর বছর ধরে এই সংকটের মূল কারণ জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের খাল দখল ও অবৈধ স্থাপনা। অথচ একের পর এক তদন্তে সত্যতা মিললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। স্থানীয়দের অভিযোগ—কোটি কোটি টাকা ঢেলে প্রশাসনের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী মানবাধিকার কর্মী আবু বক্কর চৌধুরী বলেন, “তদন্ত হচ্ছে, প্রমাণ মিলছে, কিন্তু প্রতিকার মিলছে না। মনে হচ্ছে টাকা দিয়ে সব কিছু ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।” তার দাবি, খাল উদ্ধারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় মছজিদ্দা গ্রামের অন্তত এক হাজার পরিবার কার্যত জিম্মি অবস্থায় রয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত ডিসেম্বর মাসে জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে বিষয়টি তার নজরে রয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখওয়াত জামিল সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাক্ষাৎ মেলেনি। তার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, চারটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে কাজ চলছে এবং নির্বাচনের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এভাবেই বছরের পর বছর আশ্বাসেই কেটে যাচ্ছে সময়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় সাগর ও পাহাড়ঘেরা সবুজ-শ্যামল গ্রাম ছিল মছজিদ্দা। সবজি চাষের জন্য পরিচিত এলাকাটি এখন জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত। গ্রামের দাশপাড়া অংশটি আগেই জিপিএইচ ইস্পাতের দখলে চলে গেছে। সেখানে বসবাসকারী প্রায় চার শতাধিক হিন্দু পরিবার চাপের মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। অন্য এলাকাবাসীরাও এখন বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
ভৌগোলিকভাবে মছজিদ্দা গ্রামের পূর্বে বিস্তীর্ণ জঙ্গলবাঁশবাড়িয়া পাহাড় এবং পশ্চিমে সাগর। ঐতিহাসিকভাবে পাহাড়ি ঢলের পানি ঝিরির মাধ্যমে নেমে এসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে থাকা প্রায় ৪০ ফুট প্রশস্ত খাল দিয়ে সাগরে চলে যেত। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই খাল ভরাট করেই জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য মাটির নিচে যে রিং বসানো হয়েছে, তা অপর্যাপ্ত ও উচ্চতায় বসানো হওয়ায় গ্রামে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি একটি ১৬ ফুটের ব্রিজ ভেঙে মাত্র ৫ ফুট করে দেওয়ায় বর্ষা মৌসুমজুড়ে পানিবন্দি থাকতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে।
স্থানীয়রা জানান, ভূমি অফিস, উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, পিবিআই, সিআইডি এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের একাধিক তদন্তেই খাল দখলের সত্যতা উঠে এসেছে। ইউএনও ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ অনেকেই সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। তবে বাস্তবে কোনো উচ্ছেদ বা কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
গ্রামবাসী আবুল কালাম বলেন, “ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত আইছিল, কাগজপত্র নিয়া গেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নাই। কে যেন সব দাফন করে রাখছে।”
আবু বক্কর চৌধুরীর অভিযোগ, অন্তত ছয়টি তদন্ত প্রতিবেদন চাপা দিতে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ঘুষ নিয়েছেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই সড়ক ও জনপথ বিভাগ অবৈধভাবে ফেলা মাটি অপসারণের নির্দেশ দিলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুনকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ। তার সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বা বার্তার জবাব দেননি।
এদিকে, প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সরেজমিন তদন্ত চালায়। তদন্ত টিমের প্রধান ও চট্টগ্রাম ডিভিশনাল কো-অর্ডিনেটর মনিরা পারভীন জানান, বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরও এলাকায় জলাবদ্ধতার স্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে। একটি স্কুল পরিদর্শনেও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ দেখা গেছে। এসব তথ্য ঢাকায় বেলার প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বেলা ঢাকা অফিসের লিগ্যাল কো-অর্ডিনেটর এস হাসানুল বান্না জানান, প্রতিবেদনে পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। খাল উদ্ধার, দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং মনিটরিং টিম গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজনে লিগ্যাল নোটিশ ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
খাল দখলের পাশাপাশি বসতভিটা ও আবাদি জমি দখলের অভিযোগও উঠেছে জিপিএইচ ইস্পাতের বিরুদ্ধে। বিধবা আনোয়ারা বেগম তার শেষ সম্বল ৭৮ শতাংশ জমি উদ্ধারে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। আরও কয়েকটি পরিবার জাল দলিলের মাধ্যমে জমি দখলের অভিযোগ এনে মামলা করেছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের মিডিয়া অ্যাডভাইজার অভীক ওসমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি শুধু বলেন, “আপনারা লিখে যান। কোম্পানি প্রয়োজন মনে করলে বক্তব্য দেবে।”