আইএফআইসি ব্যাংকে ২১ হাজার কোটি টাকার সঞ্চিতি ঘাটতি
নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের চাপের চিত্র উঠে এসেছে ২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির বিনিয়োগের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি (প্রভিশন) গঠনে ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকার ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণ করা হলে ব্যাংকটির লোকসান ও নিট সম্পদের পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আইএফআইসি ব্যাংক ২ হাজার ৫৬০ কোটি ২২ লাখ টাকা নিট লোকসান দেখিয়েছে। শেয়ারপ্রতি লোকসান দেখানো হয়েছে ১৩ টাকা ৩২ পয়সা। একই সময়ে ব্যাংকটির নিট সম্পদ দেখানো হয়েছে ৯৫৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা শেয়ারপ্রতি ৪ টাকা ৯৬ পয়সা।
তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ব্যাংকটির বিনিয়োগের বিপরীতে ২২ হাজার ১০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা সঞ্চিতি প্রয়োজন ছিল। এর বিপরীতে ব্যাংকটি সঞ্চিতি করেছে মাত্র ৭৯২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি গঠন না করায় ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণীতে সম্পদ, মুনাফা ও ইক্যুইটি অতিরঞ্জিত এবং দায় কম দেখানো হয়েছে।
হিসাবমান অনুযায়ী ২০২৫ সালেই পুরো সঞ্চিতি গঠন করা হলে ব্যাংকটির ওই বছরের লোকসান আরও ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা বাড়ত। সে ক্ষেত্রে মোট নিট লোকসান দাঁড়াত ২৩ হাজার ৭৭৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসানও প্রায় ১২৪ টাকায় দাঁড়াত।
একইভাবে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি গঠন করা হলে ব্যাংকটির নিট সম্পদ ঋণাত্মক ২০ হাজার ২৬৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় নেমে আসত। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি ৪ টাকা ৯৬ পয়সা নিট সম্পদের পরিবর্তে তা ঋণাত্মক প্রায় ১০৫ টাকায় দাঁড়াত।
এদিকে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ ও আদায় পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে অস্তিত্বহীন ও অযোগ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশ এখন খেলাপি হয়ে পড়ায় আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে আমানতকারীদের অর্থও ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকদের স্বল্পমেয়াদি আমানত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। এর সঙ্গে অনিয়ম ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ যুক্ত হলে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমানতকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তীতে সঞ্চিতি গঠনের ক্ষেত্রে সময় ও সুযোগ দিলেও নিরীক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল অঙ্কের সঞ্চিতি ভবিষ্যতে গঠন করতে হলে তার প্রকৃত আর্থিক প্রভাব বর্তমান হিসাবেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত ২৪ জুন থেকে আইএফআইসি ব্যাংকের সচিব মো. মোকাম্মেল হক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। কয়েক দফায় সময় নেওয়া হলেও তারা পরে কোনো বক্তব্য দেননি।
উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ৯২২ কোটি ৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালক ছাড়া শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৬৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত ১ আগস্ট ব্যাংকটির শেয়ারদর ছিল ৪ টাকা ৯০ পয়সা।