রংপুরে ৭০ হাজার গ্রাহকের ১৩৭ কোটি টাকা বীমা দাবী দিচ্ছে না ফারইস্ট লাইফ
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের রংপুর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের জমা করা অর্থ ফেরত পেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে আবেদন জানিয়েছেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন।
গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আইডিআরএর চেয়ারম্যানকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ২৬ অক্টোবর (২০২৫) ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রাহকদের জমা করা বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং কার্যালয়ের বিভিন্ন মালামাল নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা তাঁদের হাতেনাতে আটক করে কোতোয়ালি থানায় সোপর্দ করেন।
পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পক্ষে মো. ইসরাফিলসহ অন্য ভুক্তভোগীরা কোম্পানিটির প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের জমা করা প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার দাবিতে চার দফা দাবি উল্লেখ করে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন জানান। এ বিষয়ে স্থানীয় ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা দ্রুত তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে কোম্পানির চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম এমপি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি ফাঁকা হয়ে গেছে। বীমা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও অনিয়মের কারণে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধে সংকট তৈরি হয়েছে। এসব গ্রাহকের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ সহানুভূতি রয়েছে। গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য আমরা জায়গাজমি বিক্রি করে অর্থের সংস্থান করার চেষ্টা করছি। যতটা সম্ভব টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সিরিয়াল অনুসারে গ্রাহকদের অর্থ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখুন। আমাদের দায়িত্ব পালনের গত দুই বছরে কোম্পানিতে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি না, তা যাচাই করুন। আমাদের সময়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরুন। গ্রাহকেরা যেন তাঁদের পাওনা টাকা ফেরত পান, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকদের পাওনা অর্থ ফেরত চেয়ে আবেদন করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
ফখরুল ইসলাম বলেন, কারাভোগ করা কর্মকর্তাদের জামিনের জন্য কোম্পানির পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের জামিনের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। একইভাবে, কোম্পানির কোনো কর্মকর্তা অন্যায়ভাবে হয়রানি বা ক্ষতির শিকার হলে কোম্পানি তাঁর পাশে দাঁড়াবে। কোনো কর্মকর্তা অপরাধ না করেও হয়রানির শিকার হলে তাঁর সুরক্ষা নিশ্চিত করা কোম্পানির দায়িত্ব। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোম্পানি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশে থাকবে।
ফারইস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) জনসংযোগ কর্মকর্তা সাদিক আরমান বলেন, ‘রংপুরের জেলা প্রশাসক যে চিঠি দিয়েছেন, তা আমরা পেয়েছি। শুধু রংপুর নয়, আমরা সারা বাংলাদেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ ক্ষেত্রে আমাদের অনুসৃত পদ্ধতি ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট (এফআইএফও)। এই পদ্ধতির মাধ্যমেই টাকা দেওয়া হবে, এর ব্যতিক্রম হবে না।’
আইডিআরএর সাবেক সদস্য (লাইফ) সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা বলেন, ‘ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সব কার্যালয়েই চরম আর্থিক সংকট চলছে। নগদ অর্থের অভাবে গত পাঁচ বছর ধরে কোম্পানিটি মেয়াদপূর্তির দাবি (ম্যাচিউরিটি ক্লেইম), পরিশোধিত পলিসির দাবি (পেইড-আপ) কিংবা মৃত্যুদাবির (ডেথ ক্লেইম) মতো গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। কোম্পানিটির কাছে পর্যাপ্ত সরকারি সিকিউরিটিজও নেই। আগে যা ছিল, সেগুলোও তুলে নেওয়া হয়েছে।
‘কোম্পানিটির কিছু স্থাবর সম্পত্তি ও জমিজমা থাকলেও সেগুলোর মূল্য অতিমূল্যায়িত। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বে থাকা পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাও কোম্পানির স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে দেনা পরিশোধে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁরা মনে করতেন, এসব সম্পত্তি শেয়ারহোল্ডারদের। তাঁদের অবাস্তব প্রত্যাশা ছিল, অলৌকিকভাবে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এসে বাজার থেকে বিপুল ব্যবসা এনে সব দেনা শোধ করে দেবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফারইস্ট লাইফে লুটপাট ও দুর্নীতি শুধু আওয়ামী লীগের লোকজনের মাধ্যমে হয়নি। কোম্পানির নজরুল ও খালেক কখনোই আওয়ামী লীগের লোক ছিলেন না; তাঁরা জামায়াতের লোক ছিলেন। নিজেদের সুবিধার্থে তৎকালীন সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয় নিলেও তাঁরা মূলত নিজেদের স্বার্থ ও সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে আর্থিক অনিয়ম ও লুটপাট চালিয়েছেন।’
সুলতান-উল-আবেদীন বলেন, বর্তমানে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। কর্তৃপক্ষটি কিছু কোম্পানির জমি বিক্রি এবং স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও সিকিউরিটিজ ভাঙিয়ে ইতিমধ্যে পলিসি গ্রাহকদের পাওনার একটি অংশ পরিশোধ করেছে।