রূপালী ব্যাংকে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের নজর

৮০১ কর্মকর্তার শিক্ষাগত সনদ ও নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি তলব
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও ঋণ বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই অংশ হিসেবে ব্যাংকের ২০১৪ সালে সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে পদোন্নতি পাওয়া ১০ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে। গত ৫ ও ৬ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাঁদের হাজির হতে নোটিশ পাঠায় সংস্থাটি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, রূপালী ব্যাংক পিএলসি-এর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ এবং গৃহনির্মাণ ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের সহকারী পরিচালক (ব্যাংক) মোহাম্মদ আজগর হোসেনকে দলনেতা এবং উপসহকারী পরিচালক মো. ইয়াছিন মোল্লাকে সদস্য করে দুই সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে ওই ১০ কর্মকর্তার বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধান টিমের দলনেতা মোহাম্মদ আজগর হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিশে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও-কে এই কর্মকর্তাদের যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

২০১৪ সালে রূপালী ব্যাংকে ৭৫১ জন অফিসার ও ৪০১ জন সিনিয়র অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়। কমার্শিয়াল ইনভেস্টিগেশন টিমের বিশেষ অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ৬২ জনের বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার, পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে চাকরিতে যোগদানসহ নানা অভিযোগ আনা হয়। এদের মধ্যে দুদকের দুটি আলাদা চিঠিতে ১০ জনকে তলব করা হয়।

৫ ও ৬ জুলাই তলব করা হয়েছে যাঁদের

দুদকের নোটিশ অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই (রবিবার) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে ৫ জন কর্মকর্তাকে তলব করা হয়। তাঁরা হলেন— প্রিন্সিপাল অফিসার তাপসী রায়, তানভীর আহম্মেদ চৌধুরী, মনির হোসেন, অমৃত কুমার বারুরী ও মো. আখেরুল ওয়ালিদ। পরের দিন, ৬ জুলাই (সোমবার) একই সময়ে বাকি ৫ কর্মকর্তাকে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। তাঁরা হলেন— প্রিন্সিপাল অফিসার সজিব সরদার, মাহমুদুল হাসান টুটুল, আমিনুল ইসলাম ইসলাম বুলবুল, মো. আলমগীর হোসেন ও সাম্মী আক্তার।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাঁদের সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রের মূল কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র, নিয়োগ পরীক্ষার আবেদনের কপি, প্রবেশপত্র, ভাইভা কার্ড এবং কোটা সুবিধা নিয়ে থাকলে তার সনদসহ উপস্থিত হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তলবকৃত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশই রূপালী ব্যাংক লিমিটেড ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। এর মধ্যে আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও সজিব সরদার সাংগঠনিক সম্পাদক, মাহমুদুল হাসান টুটুল মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা সম্পাদক, মো. আলমগীর হোসেন ক্রীড়া সম্পাদক, অমৃত কুমার বারুরী সাংস্কৃতিক সম্পাদক, তানভীর আহমেদ চৌধুরী আন্তর্জাতিক সম্পাদক এবং আখেরুল ওয়ালিদ সাংগঠনিক সম্পাদক (মোবাইল ব্যাংকিং বিভাগ) পদে ছিলেন। ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তৎকালীন সময়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন ও অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে, যা এখন দুদকের জালে উঠে আসছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মাহমুদুল হাসান টুটুল বলেন, “আমার সব কাগজপত্র ঠিক আছে। আমি এখানে নিয়মমাফিক আবেদন করে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি করার সুযোগ পেয়েছি। আমি ৩৩ ও ৩৪তম বিসিএসের ভাইভা দিয়ে নন-ক্যাডার পেয়েছিলাম। এই অভিযোগ কেন উঠেছে আমি জানি না, আল্লাহর রহমতে আমার কোনো সমস্যা নেই।”

এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংক পিএলসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা ও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

৮০১ কর্মকর্তার সনদ তলব

এদিকে দুদকের আরেকটি চিঠিতে জানা যায়, রূপালী ব্যাংকে ২০১৪ সালে নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র অফিসার ও অফিসারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আরও ৮০১ জন কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ তলব করেছে সংস্থাটি। সম্প্রতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে দুদক সংশ্লিষ্টদের এমসিকিউ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন খাতা এবং নিয়োগসংক্রান্ত অন্যান্য নথি চেয়েছে। পাশাপাশি ভুয়া বা জাল সনদের মাধ্যমে নিয়োগের বিষয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এলে সেটিও সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

চিঠিতে ২০১৪ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর এবং স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানার তথ্যও চাওয়া হয়েছে। প্রতিটি ধাপে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের কপি ও নিয়োগপ্রাপ্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।

আরো