মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সামনে আবার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রথমবারের মতো তিন মাস মেয়াদি এ মুদ্রানীতিতে মূল্য স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান।
মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর বলেন, গত দুই মাস মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিম্নমুখী থাকলেও আগামী দিনগুলোতে এই অবস্থান অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের জ্বালানি মূল্যসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপট মূল্যস্ফীতি বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি হ্রাসের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা প্রদান করাই বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ। এ জন্য বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রেখে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক কৌশল অনুসরণ করা হবে।
এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ঋণ সহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতের শক্তিশালীকরণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে বিনিময় হারের নমনীয়তা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হবে। মূল্য স্থিতিশীলতা, বাহ্যিক খাতের ভারসাম্য এবং আর্থিক ব্যবস্থার দৃঢ়তা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সামগ্রিক লক্ষ্য।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে সতর্কতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা কমতির প্রবণতা দেখা গেলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
এ অবস্থায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ফলে নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনীতির উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বেসরকারি ঋণে ধীরগতি
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি দুর্বল রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। জুনে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ছিল সর্বনিম্ন রেকর্ড।
বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ সুদের কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কম থাকায় সেই অর্থের বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না।
বিনিয়োগে গতি ফেরাতে গত ২ আগস্ট নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণের খরচ কমিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে এরপরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে।
তিন মাসের মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন
এবারই প্রথমবারের মতো তিন মাস মেয়াদি মুদ্রানীতি ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এত দিন সাধারণত জানুয়ারি-জুন ও জুলাই-ডিসেম্বর— ছয় মাস মেয়াদে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো।
নতুন ব্যবস্থায় অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান দ্রুত সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে। মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, তারল্য ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়ে নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অবস্থানে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রেখে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট খাতে ঋণ সহায়তা, আর্থিক খাতের সংস্কার ও শক্তিশালীকরণ এবং বিনিময় হারের নমনীয়তা সুশৃঙ্খলভাবে বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ অবস্থায় আগামী তিন মাসে মূল্যস্ফীতির গতিপথ, বেসরকারি ঋণের চাহিদা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও বৈদেশিক খাতের অবস্থার ওপর নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী নীতিগত পদক্ষেপ।