প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তায় এক উৎসের তথ্যের ওপর নির্ভরতা যথেষ্ট নয়
লেখক: ওলেগ শাবুরভ, থ্রেট ইন্টেলিজেন্স বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার, ক্যাসপারস্কি
সাইবার নিরাপত্তায় থ্রেট ডেটা ফিড বা সাইবার হুমকি সংক্রান্ত তথ্য প্রায়ই একটি সাধারণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়। অথচ প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাড়ির কর্মক্ষমতা যেমন জ্বালানির মানের ওপর নির্ভর করে, তেমনি নিরাপত্তা সরঞ্জামের কার্যকারিতাও নির্ভর করে হুমকিসংক্রান্ত তথ্যের মানের ওপর। এসব তথ্য হতে হবে নির্ভুল, হালনাগাদ ও পূর্ণাঙ্গ। পাশাপাশি হুমকির ধরন ও প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যও থাকতে হবে।
সাইবার হামলা আরও নিয়মিত ও জটিল হয়ে ওঠায় নির্ভরযোগ্য থ্রেট ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োজন বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সাইবার অপরাধীদের দ্রুত ও বড় পরিসরে হামলা চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, নিরাপত্তা দলগুলোকে বিভিন্ন উৎসে ছড়িয়ে থাকা তথ্য এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়লেও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
মানসম্মত হুমকি-তথ্য না থাকলে এসআইইএম, এসওএআর, ইডিআর, এক্সডিআর ও এনজিএফডব্লিউ-এর মতো উন্নত নিরাপত্তা সরঞ্জাম থেকেও সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যায় না। অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে নিরাপত্তা দলগুলো ভুল সূত্র ধরে তদন্ত করতে পারে, এতে সময় ও অর্থ নষ্ট হয়। তাই হুমকি শনাক্ত করা এবং শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নিতে যে সময় লাগে, তা কমানো জরুরি। নির্ভরযোগ্য থ্রেট ইন্টেলিজেন্স নিরাপত্তা দলগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা চিহ্নিত করতে, ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে এবং দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। অর্থাৎ, হুমকিসংক্রান্ত তথ্যের মান উন্নত করা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিনিয়োগেরই অংশ।
থ্রেট ডেটা ফিড হলো সাইবার হুমকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্যের একটি নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা, যা কম্পিউটার প্রোগ্রাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। এতে ক্ষতিকর আইপি ঠিকানা, ডোমেইন, ওয়েব ঠিকানা (URL) এবং ফাইল শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হ্যাশের মতো তথ্য থাকে। নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেটওয়ার্কে আদান-প্রদান হওয়া তথ্য ও সিস্টেমের লগের সঙ্গে এসব সূচক মিলিয়ে সম্ভাব্য সাইবার হামলা শনাক্ত করে।
কার্যকর থ্রেট ডেটা ফিড তৈরির জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সুরক্ষিত ডিভাইস থেকে পাওয়া পরিচয়বিহীন তথ্য, ম্যালওয়্যার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত সাইবার হামলা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ, হানিপট, স্প্যাম শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ওয়েব পর্যবেক্ষণ, প্যাসিভ ডিএনএস, বটনেট পর্যবেক্ষণ, অংশীদারদের তথ্য এবং উন্মুক্ত উৎস থেকে পাওয়া তথ্য। এরপর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ, যাচাই ও সমৃদ্ধ করা হয়।
ক্যাসপারস্কির ক্ষেত্রে, উদাহরণ হিসেবে, বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে বাস্তবে শনাক্ত হওয়া হুমকির তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান ও পরিচিত ম্যালওয়্যারের তথ্য যাচাই করে মেশিন লার্নিং এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়। নিয়মিত পুনরায় যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সময়ের সঙ্গে কোনো হুমকির সূচকের কার্যকারিতা বদলে যেতে পারে। এ কারণে কিছু তথ্য সরবরাহব্যবস্থা প্রতি ২০ মিনিট অন্তরও হালনাগাদ করতে হয়।
তবে কোনো একটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য দিয়েই সব ধরনের সাইবার হুমকি শনাক্ত করা সম্ভব, এমন ধারণা ঠিক নয়। একাধিক উৎস থেকে থ্রেট ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ করলে নিরাপত্তার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা এবং হুমকির আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
এর একটি বড় কারণ হলো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা। কোনো আঞ্চলিক সেবাদাতা স্থানীয় সাইবার হামলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে, কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের হুমকি সম্পর্কে তার তথ্য সীমিত হতে পারে। বিপরীতে, বৈশ্বিক সেবাদাতার পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে পরিচালিত ছোট পরিসরের হামলা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। একাধিক উৎস ব্যবহার করলে এই সীমাবদ্ধতা কমানো যায়।
সেবাদাতাদের সরবরাহ করা তথ্যের বিস্তারিত বিবরণেও পার্থক্য থাকে। কেউ হয়তো শুধু একটি ক্ষতিকর ফাইলের হ্যাশ সরবরাহ করে। অন্য কোনো উৎস থেকে একই ফাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী, ব্যবহৃত সফটওয়্যারের দুর্বলতা কিংবা হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এসব বাড়তি তথ্যের সাহায্যে নিরাপত্তা দলগুলো কোনো ঘটনার গুরুত্ব নির্ধারণ করতে এবং কোন হুমকির বিরুদ্ধে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে, তা ঠিক করতে পারে।
তথ্য সংগ্রহের পরিধিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কোনো সাইবার হামলা প্রথমে শুধু সেই সেবাদাতার নজরে আসতে পারে, যার গ্রাহকেরা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। একাধিক থ্রেট ডেটা ফিড ব্যবহার করলে নতুন হুমকি দ্রুত শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে একই তথ্য বারবার পাওয়া, ভুল সতর্কবার্তা এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কোনো একটি উৎসের তথ্য যাচাই না করে পুরোপুরি নির্ভর করলে বৈধ নেটওয়ার্ক কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা দলকে ভুল সতর্কবার্তা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় তদন্ত করতে হতে পারে।
একাধিক থ্রেট ডেটা ফিড ব্যবহারের উদ্দেশ্য শুধু একই তথ্য একাধিকবার সংগ্রহ করা নয়। বরং এর লক্ষ্য হলো হুমকি শনাক্তের ঘাটতি কমানো এবং অন্য একটি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করার সুযোগ তৈরি করা। তাই সেবাদাতা নির্বাচনের সময় তথ্যের উৎস ও মান, নির্ভরযোগ্যতা, ভুল সতর্কবার্তার হার, তথ্য হালনাগাদের গতি, সরবরাহ করা সূচক ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ধরন, লাইসেন্সের শর্ত, প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ এবং বিশেষজ্ঞ সহায়তার বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত।
সবশেষে, সেবাদাতার প্রচারমূলক দাবির ওপর নির্ভর না করে থ্রেট ইন্টেলিজেন্সের কার্যকারিতা নিজস্ব পরিবেশে যাচাই করা জরুরি। পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে তথ্যের মান যাচাই করতে হবে, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিস্টেমে সেগুলো পরীক্ষা করতে হবে এবং বিভিন্ন উৎসের তথ্য একসঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করে, তা মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি এসব তথ্য ব্যবহারে নিরাপত্তার বাস্তব উন্নতি হচ্ছে কি না, সেটিও পরিমাপ করা প্রয়োজন।
থ্রেট ইন্টেলিজেন্সকে সাধারণ পণ্য হিসেবে না দেখে প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তার কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সঠিক তথ্য ও একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎসের সমন্বয় নিরাপত্তা দলগুলোর কাজের চাপ কমাতে পারে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে।