১৯ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণে সংকটে রূপালী ব্যাংক
খেলাপি ঋণের পাহাড় ও অনাদায়ী অর্থ আদায়ে চরম স্থবিরতার কারণে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির প্রায় ১৯ হাজার ৮০৫ কোটি টাকার মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকেরও বেশি আটকে রয়েছে মাত্র ২০ জন বড় ঋণগ্রহীতার কাছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স’ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) এসব শীর্ষ খেলাপির ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা পাওনার বিপরীতে ব্যাংকটি উদ্ধার করতে পেরেছে নামমাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকাই খেলাপি, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৭.৯৮ শতাংশ। এতে ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকায়। গত ২০২৪ সালে শীর্ষ খেলাপিদের থেকে ৪৫.৭০ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৩৬১ কোটি টাকা আদায় হলেও ২০২৬-এর প্রথম অর্ধে তা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অথচ চলতি বছর ব্যাংকটির সর্বমোট ২,৩০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে জুন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩৩০ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ (৯৯৪ কোটি টাকা) এবং বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (৯০৮ কোটি টাকা)। এ ছাড়া ক্রনি গ্রুপ (৮৭২ কোটি), জুট টেক্সটাইল মিলস (৭২৪ কোটি), নূরজাহান গ্রুপ (৬৩০ কোটি), এইচএস কম্পোজিট (৬২০ কোটি), মাদারীপুর স্পিনিং (৬১৮ কোটি), বদর স্পিনিং (৬০৪ কোটি), ডলি কনস্ট্রাকশন (৫০৬ কোটি) এবং সাত্তার গ্রুপসহ (৪০৩ কোটি) বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের অর্থ আটকে রেখেছে। তবে পুনর্গঠনের (রেসিডিউলিং) মাধ্যমে বসুন্ধরা পেপার মিলস, ইউনিভার্সেল মেডিকেল, বেনীটেক্স ও জুট টেক্সটাইল মিলস সাময়িকভাবে খেলাপি তালিকা থেকে বের হয়েছে।
আদায় মন্দা সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ অবলোপন (রাইট-অফ) থামেনি। ২০২৪ সালে ৫১৮ কোটি ও ২০২৫ সালে ৪৯৪ কোটি টাকা অবলোপনের পর ২০২৬-এর প্রথম ছয় মাসে আরও ৪৯০ কোটি টাকা ব্যালেন্স শিট থেকে কমানো হয়েছে। যদিও অবলোপনকৃত খাত থেকে জুন পর্যন্ত আদায় এসেছে মাত্র ৪.১৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি, অর্থ ঋণ আদালতে রূপালী ব্যাংকের ১২,৬৬৪ কোটি টাকার ২,৫৯৬টি মামলা ঝুলে থাকায় আইনি আইনি দীর্ঘসূত্রতা পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশাল খেলাপি ও প্রভিশনিংয়ের চাপে জুন শেষে ব্যাংকের পরিচালন লোকসান ২৩৩ কোটি এবং নিট লোকসান ৩৯৭ কোটি টাকায় ঠেকেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি খেলাপি ব্যাংকের তারল্য সংকট বাড়িয়ে উৎপাদনশীল খাতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা পুঁজিবাজারে ব্যাংকটির শেয়ার দর ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধস নামাচ্ছ।
তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রূপালী ব্যাংক কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে; প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০০ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০৫ কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে। পরিস্থিতি সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন’ (পিসিএ) কাঠামোর আওতায় কড়া তদারকি এবং শীর্ষ খেলাপিদের থেকে নগদ আদায় জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে।