অর্থ আত্মসাতের মামলায় কারাগারে সাবেক সিইও

ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন লংঘন, অনিয়ম, দুর্নীতিতে ডুবছে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স। আওয়ামী শাসন আমলের দীর্ঘ বছরে এই প্রতিষ্ঠান ছিল লুটপাটের স্বর্গরাজ্য। প্রভাবশালী মহলের আর্শিবাদে সোনার বাংলা থেকে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। সম্প্রতি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ও প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

সবশেষ সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হলো সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আব্দুল খালেক মিয়াকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রোববার আব্দুল খালেক মিয়া ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিন চাইলে বিচারক তা নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে একই মামলার অপর দুই আসামি খালেক মিয়ার স্ত্রী পারভীন আক্তার এবং সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের সাবেক কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামের জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শুধু খালেক একা নন, সোনার বাংলার অর্থলোপাটে এর সঙ্গে আরও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত ছিল। মূলত বীমা আইন লঙ্ঘন করে সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছিল সোনার বাংলা। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ আমলে শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান থাকায়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে শুরু করে দেশের কোনো সংস্থাই সোনার বাংলাকে যথাযথ মনিটরিং করেনি। তৎকালীন সেই রাজনৈতিক প্রভাব ও লুটপাটের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৯ মে থেকে ২০২২ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আব্দুল খালেক মিয়া সহযোগী প্রতিষ্ঠান সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের নমিনি পরিচালক ও ব্যাংক হিসাব পরিচালনার সিগনেটরি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। এই পদের অপব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন সময়ে ভুয়া ও কাল্পনিক ব্যক্তির নামে ক্যাশ চেক ইস্যু করে এবং ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করে কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ করেন। এর মধ্যে তাঁর স্ত্রী পারভীন আক্তারের নামে ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া মঞ্জুর রহমান, আখি সরকার ও শেখ কবির হোসেনের নামে বিভিন্ন সময়ে চেকের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৮৪ লাখ ১২ হাজার টাকাসহ অন্যান্য উপায়ে সর্বমোট ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। পরবর্তীতে কোম্পানির পক্ষ থেকে আসামিদের কাছে একাধিকবার ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য আইনি নোটিশ পাঠানো হলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি।

২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. তানভীর ইসলাম বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৮, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৩৪ ধারায় এই মামলা দায়ের করেন। আদালতে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম।

এদিকে এ বিষয়ে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান সিইও মো. শামসুল হুদার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অর্থ আত্মসাৎ মামলায় সাবেক সিইও আবদুল খালেকের জামিন বাতিল হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট এই অনিয়ম ও লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বীমা খাতের সুশাসন এবং পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ সুরক্ষায় আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অতীতে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ ধরনের আর্থিক অপরাধ ও লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অনিয়ম করার সাহস না পায়।

[atn_photocard]
আরো