ঋণে ভারাক্রান্ত বিএসআরএম স্টিলস

সুদজনিত ব্যয়ের চাপের মধ্যে থাকা পুঁজিবাজার-তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এন্টারটেইনমেন্ট খাতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়েছে। এই অস্বাভাবিক ব্যয় দেখে বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

তাদের অভিযোগ—যে প্রতিষ্ঠানের সুদের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে এবং তা পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ নামে ব্যয় দেখানো দায়িত্বহীনতার পরিচয়। বিনিয়োগকারীরা এমন প্রশ্নও তুলেছেন—বাস্তবেই কি এত বিপুল অর্থ এ খাতে খরচ হয়েছে, নাকি কাগজে-কলমে ব্যয় দেখিয়ে অর্থের অপব্যবহার হয়েছে? সঠিক তদন্ত হলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে তাঁদের মন্তব্য।

রেকর্ড পরিমাণ খরচ

সংকলিত তথ্যে দেখা যায়, ৩০ জুন ২০২৫ শেষে অর্থবছরে কোম্পানিটি এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ খরচ দেখিয়েছে ৮ কোটি ১৮ লাখ ২৯ হাজার ২৫২ টাকা, যেখানে আগের বছর ব্যয় ছিল মাত্র ১ কোটি ৯৫ লাখ ৬৯ হাজার ৪৮২ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় বেড়েছে ৩১৮%।

গত ১৬ বছরের মধ্যে এটিই এ খাতে কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ব্যয়। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে—আসলেই কি এ বাবদ এত খরচ হয়েছে, নাকি এর আড়ালে অন্য কিছু লুকানো আছে?

স্থায়ী সম্পদে অস্বাভাবিক বিনিয়োগ

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সদ্য বিদায়ী বছরে বিএসআরএম স্টিলস স্থায়ী সম্পদ অধিগ্রহণে ব্যয় করেছে ১,৬৩৫ কোটি ২৭ লাখ ৩১ হাজার ৬২৫ টাকা, যেখানে আগের বছর ব্যয় ছিল ১২৫ কোটি ২৬ লাখ ২৫ হাজার ১২১ টাকা। অর্থাৎ ব্যয়ের বৃদ্ধি ১,২০৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে কোম্পানির সিএফও নুরুল করিম জানান—মিরেশ্বরাইতে বছরে ছয় লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষমতার নতুন রোলিং মিল স্থাপনের ফলে স্থায়ী সম্পদ অধিগ্রহণে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়েছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করেন—এ খাতে প্রদর্শিত ব্যয়ের সঠিকতা নিশ্চিত করতে বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।

ঋণ ও সুদজনিত ব্যয়ের উল্লম্ফন

২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিয়েছে ২,২২৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১,৩৮০ কোটি টাকার বেশি। একই সঙ্গে ফাইন্যান্স কস্ট বেড়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ

সিএফওর বক্তব্য অনুযায়ী—নতুন রোলিং মিল প্রকল্পে ২,১০০ কোটি টাকা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার ছয় মাসের সুদ ফাইন্যান্স কস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগকারীদের মন্তব্য

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলেন, সুদের ব্যয় বাড়তে থাকলে তা কোম্পানির ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক প্রতিষ্ঠান উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতির মধ্যে জড়িয়ে পড়ে, এবং প্রকল্প সফল না হলে প্রতিষ্ঠান ঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে পড়ে—ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

এন্টারটেইনমেন্ট খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সিএফও কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দেননি। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ—খরচের বিস্তারিত উল্লেখ না করায় প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়, এবং কম খরচ করে বেশি দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশীদ চৌধুরীর ভাষ্যমতে—এন্টারটেইনমেন্ট খাতে দেখানো ব্যয়ের বড় অংশই ‘অবাস্তব’, যা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে। তিনি বলেন, বিএসইসির উচিত নতুন অডিটর নিয়োগ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা।

মালিকানা কাঠামো

কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৩৭৫ কোটি ৯৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যেখানে মালিকানা বিতরণ এভাবে—

উদ্যোক্তা-পরিচালক: ৭২.০৬%

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী: ১৮.৫২%

বিদেশি বিনিয়োগকারী: ০.২৫%

সাধারণ বিনিয়োগকারী: ৯.১৭%

[atn_photocard]
আরো