শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পূবালী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানকে ঘিরে একাধিক গুরুতর আইনি বিষয় সামনে এসেছে। পূবালী ব্যাংকের শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে আদালতের রায় অমান্যের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেও তাঁর নাম এসেছে।

শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে দীর্ঘ আইনি বিরোধ

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ৩০ মে তাশিয়া খানম তাঁর মালিকানাধীন ৩০ হাজার ৩৪৭টি শেয়ার সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইনের কাছে বিক্রি করেন। এ জন্য তিনি একটি বৈধ শেয়ার হস্তান্তর দলিলও সম্পাদন করেন। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পাঁচ দিন পর তাশিয়া খানম জালিয়াতির অভিযোগ তুলে মামলা করেন।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেন, শেয়ার হস্তান্তর বৈধ ছিল এবং তাশিয়া খানমের স্বাক্ষর জাল করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগ ও রিভিউ পর্যায়েও ওই রায় বহাল থাকে বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালতের রায়ের পরও শেয়ার ও ডিভিডেন্ড হস্তান্তরের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায়ের পর আপিল বিভাগের দেওয়া ছয় সপ্তাহের স্থগিতাদেশ ২০১১ সালের ২৭ জুন শেষ হয়। এরপর নতুন কোনো স্থগিতাদেশ না থাকা সত্ত্বেও মঞ্জুরুর রহমানের সভাপতিত্বে ১৩ জুলাই পূবালী ব্যাংকের ৮৩০তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় শেয়ারসংক্রান্ত বোনাস শেয়ার ও ডিভিডেন্ড তাশিয়া খানমের নামে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনাকে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইন আদালত অবমাননার আবেদন করেন। তাঁর দায়ের করা কনটেম্পট পিটিশন নম্বর ৩৮৪/২০২৬। মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে।

গত ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ

আগাম শীতের সবজিতেও দামের উত্তাপ

বিশ্ববাজারে ৬ মাসের সর্বোচ্চে তেলের দাম

আবেদনকারীর দাবি, তাঁর নামে ২ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ৩৯৭টি শেয়ার নিবন্ধন করতে হবে। পাশাপাশি ৫১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি লভ্যাংশ ও সুদ পরিশোধের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

ডেল্টা লাইফে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

পূবালী ব্যাংকের শেয়ার বিরোধের পাশাপাশি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও আলোচনায় রয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্দেশে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান একনাবিনের (ACNABIN) করা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটিতে ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার জালিয়াতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের চিত্র উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মঞ্জুরুর রহমান ও তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে ৬৩৮ কোটি টাকা অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করেছে বলে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া ডেল্টা লাইফের শেয়ারহোল্ডার ও পলিসি গ্রাহক মানিক রতন চাকমা বনানী থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটির তদন্তে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ তুলে তিনি মহানগর আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আদালত ওই রিভিশন মঞ্জুর করেন। পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্তভার দুদকে স্থানান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

আদালতের রায় ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন

আইনগতভাবে চূড়ান্ত রায় বহাল থাকার পরও একই বিষয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা রায়ের কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ ও রিভিউ পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয়ে Res Judicata নীতি প্রযোজ্য হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারির ঘটনাটি শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে রুল জারি হওয়া নিজেই আদালত অবমাননার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; এ বিষয়ে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংক ও বিমা খাতের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শেয়ার মালিকানা, ডিভিডেন্ড বণ্টন, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং আদালতের আদেশ প্রতিপালনের বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং অভিযোগগুলোর বিচারিক মূল্যায়নের ওপরই পরবর্তী আইনি অবস্থান নির্ভর করবে।

[atn_photocard]
আরো