প্রাইম ইসলামী লাইফে ২০৮ কোটি টাকার ঘাটতি, ঝুঁকিতে ১৮৮ কোটি বিনিয়োগ
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানি প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের আর্থিক হিসাবে ভয়াবহ অনিয়ম ও বিধি লঙ্ঘনের চিত্র ধরা পড়েছে। সরকারি সিকিউরিটিজে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঘাটতির পাশাপাশি শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে থাকলেও সে অনুযায়ী কোনো নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখেনি কোম্পানিটি। এসব কারণে ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ‘শর্তসাপেক্ষ মতামত’ (কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন) দিয়েছেন নিরীক্ষক।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সমাপ্ত বছরের আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে নিরীক্ষক এই মতামত দিয়েছেন। প্রতিবেদনে তিনটি বিষয়ে আলাদাভাবে গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি আগের বছরেও একই ধরনের অনিয়ম বিদ্যমান থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রবিধানমালা অনুযায়ী, জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা বাধ্যতামূলক। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে কোম্পানিটির সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২৭ কোটি টাকা। অথচ আইন অনুযায়ী, ৭৮২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার গ্রহণযোগ্য সম্পদের বিপরীতে কোম্পানিটির অন্তত ২৩৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকার কথা ছিল। অর্থাৎ এই খাতে কোম্পানিটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। যা সরাসরি বীমা বিধিমালার লঙ্ঘন।
নিরীক্ষক জানিয়েছেন, পিএফআই প্রোপার্টিজ ও পিএফআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডে কোম্পানিটির প্রায় ১৮৮ কোটি ১১ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে, যা ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী। এই অর্থ আদায়ে উচ্চ আদালতে মামলা চললেও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯) অনুযায়ী কোনো নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা ইমপেয়ারমেন্ট রাখা হয়নি। ফলে আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একইভাবে স্টার্লিং গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানে কোম্পানিটির ১৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ ২০১৮ সাল থেকে আটকে আছে। এটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এছাড়া বাংলালায়ন জিরো কুপন বন্ডে বিনিয়োগ করা প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং এর বিপরীতে ৩ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অনাদায়ী হয়ে আছে। বন্ডটির মেয়াদ ২০২০ সালে শেষ হলেও অর্থ উদ্ধার অনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। সব মিলিয়ে ১৮৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে থাকলেও এর বিপরীতে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আইডিআরএর প্রবিধানমালা অনুযায়ী, গ্রহণযোগ্য সম্পদের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত ‘অনুমোদিত অন্যান্য বিনিয়োগ’ হিসেবে রাখা যায়। প্রাইম ইসলামী লাইফের জন্য এই সীমা ছিল ৩৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। কিন্তু কোম্পানিটি নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি বিনিয়োগ করে রেখেছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও দায় নিরূপণে বাধ্যতামূলক ‘অ্যাকচুয়ারিয়াল তদন্ত ও মূল্যায়ন’ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রাইম ইসলামী লাইফ এই মূল্যায়ন সম্পন্ন করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি বীমা গ্রাহকদের সুরক্ষা ও কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজের কাছ থেকে ২০১৮ সাল থেকে ১৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা লভ্যাংশ পাওনা থাকলেও তা আদায় হয়নি। এছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে কোম্পানিটির ২ কোটি ৮২ লাখ টাকার অনাদায়ী লোকসান (আনরিয়েলাইজড লস) রয়েছে। উদ্যোক্তা ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার ধারণের অনুপাতও আইডিআরএর নিয়ম অনুযায়ী নেই।
২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদনেও সরকারি সিকিউরিটিজে ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ও অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন না করার মতো একই ধরনের গুরুতর অনিয়ম পাওয়ার কথা বলেছে নিরীক্ষক। বারবার সতর্ক করার পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
কোম্পানিটি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের নির্ধারিত সীমাও অতিক্রম করেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের জন্য অনুমোদিত সীমা ছিল ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তবে কোম্পানিটি ব্যয় করেছে ২২ কোটি ৫ হাজার টাকা। ফলে নির্ধারিত সীমার তুলনায় ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উত্থাপিত পর্যবেক্ষণগুলো নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ। কোম্পানির সচিব আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে বাংলা লায়ন, পিএফআই ও স্টার্লিং গ্রুপে আটকে থাকা বিনিয়োগের অর্থ উদ্ধারে করা মামলাগুলো বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত হিসাব সমন্বয় বা প্রভিশন করা সম্ভব নয়।’
তার ভাষ্য, ‘একই কারণে আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী ইম্পেয়ারমেন্ট প্রভিশনও রাখা হয়নি। আদালতের রায়ের আগে এ ধরনের প্রভিশন নিলে বিনিয়োগের অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা নিয়ে পলিসিহোল্ডার ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে।’
নিরীক্ষক প্রতিবেদনে সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে ২০৭ কোটি টাকার ঘাটতির বিষয়ে আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম দাবি করেন, ‘এ ঘাটতির বেশির ভাগই ২০১৮ সালের আগের ব্যবস্থাপনার সময় সৃষ্টি হয়েছে। তখন কোম্পানির সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। বর্তমান ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়েছে।’
সম্পদের মূল্যায়নসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের বিষয়ে তিনি জানান, ২০২৪ সালের মূল্যায়ন প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের মূল্যায়নের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং শিগগিরই তা সম্পন্ন হবে।
কোম্পানি সচিব বলেন, নিরীক্ষকের কোয়ালিফাইড মতামতের অধিকাংশ বিষয়ই বিচারাধীন মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত। মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হলে এসব পর্যবেক্ষণও আর থাকবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, ‘প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদন এখনো সংস্থাটির কাছে জমা পড়েনি। প্রতিবেদন জমা দিতে কোম্পানিকে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রাইম ইসলামী লাইফ ২০২৫ হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের মাত্র ০.২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে। ঘোষিত লভ্যাংশসহ অন্যান্য এজেন্ডায় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) হওয়ার কথা রয়েছে। কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত জীবন বীমা তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮২ কোটি ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
এর আগে ২০২৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। ২০২৩ সালে ১ শতাংশ, ২০২১ সালে ২ শতাংশ, ২০১৯ সালে ১০ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। ২০২০ সালেও কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি।
এদিকে, আলফা ক্রেডিট রেটিং পিএলসি ২০২৪ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি সার্ভিল্যান্স রেটিং ‘এ প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি রেটিং ‘এসটি-২’ বহাল রেখেছে।
২০০৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রাইম ইসলামী লাইফের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি এবং পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট ৩ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার ২৩০টি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৩৬.০৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৩.২৩ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ০.১৮ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩০.৫১ শতাংশ। কোম্পানিটি বর্তমানে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। সর্বশেষ ডিএসইতে শেয়ারটি ৪৩ টাকা ৩০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।