ইসলামী ব্যাংকের ৬৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ: জাবেদসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে আরামিট সিমেন্ট পিএলসির নামে ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগে ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

আসামিদের মধ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রী ও আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমিলা জামান, প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা এবং ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. রুবেল হোসেন বাদী হয়ে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এ মামলাটি দায়ের করেন। ঘড়িকিনুন

মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়, ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের বহদ্দারহাট শাখায় আরামিট সিমেন্টের নামে একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের ১৫ মে হিসাবটি জুবিলি রোড শাখায় স্থানান্তর করা হয়।

এরপর ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর আরামিট সিমেন্টের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামান ওই শাখায় ৫০০ কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন ঋণের আবেদন করেন। একই বছরের ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটির ৫১তম সভায় ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পরে ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটি তা অনুমোদন করে।

দুদকের অভিযোগ, ঋণের অর্থ বিতরণের জন্য ভুয়া বাই-মুরাবাহা ডিল তৈরি করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় আরামিট সিমেন্টের হিসাব বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো হয়। তার নামে ‘ক্লাসিক ট্রেডিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির নামে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে পণ্য সরবরাহ না করেই সরবরাহের ভুয়া তথ্য ব্যাংকে দাখিল করা হয়। এসব নথির ভিত্তিতে বাই-মুরাবাহা ডিল অনুমোদন ও ঋণের অর্থ বিতরণ করা হয় বলে অভিযোগ করেছে দুদক।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, আরামিট সিমেন্টের নামে মোট ৫৪টি বাই-মুরাবাহা ডিলের মাধ্যমে ২০৫ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণের অর্থ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ২৭টি ডিলের মাধ্যমে ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন ও স্থানান্তর করা হয়। রেটদেখুন

দুদকের অভিযোগ, ঋণের অর্থ আরামিট গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- আরামিট সিমেন্টের চিফ ফাইন্যান্সশিয়াল অফিসার ও ইউসিবির সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ শাহ্ আলম, আরামিট সিমেন্ট পিএলসির এজিএম একেএম মারুফ, ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী ও আরামিটের এজিএম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, ইসলামী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মো. মহিউদ্দীন, মোহাম্মদ আখতার হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুল হক, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আবদুল কাদের, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আবদুল করিম, মো. শহিদুল্লাহ, এফএভিপি মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, এসভিপি আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ মহসীন আলী ও এসপিও রিদওয়ানুল হক।

সাইফুজ্জামান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদকের একটি যৌথ দল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পট পরিবর্তনের তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ‍শুরু করে দুদক। অর্থপাচার, অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগে সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে দুদক।

এছাড়া ২০২৫ সালের মার্চে তার ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ২৩টি কোম্পানির শেয়ার জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। একই অনুসন্ধানের বিভিন্ন পর্যায়ে তার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাবও অবরুদ্ধ করা হয়।

চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি দুদকের আবেদনে সাইফুজ্জামানের যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে থাকা ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেয় আদালত।

দুদকের হিসাবে, এসব সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি কোম্পানিতে তার বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। আর ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে তার নামে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়।

দুদকের আবেদনে এসব সম্পদের মূল্য ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড দেখানো হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ২৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে করা এক মামলায় চলতি বছরের মার্চে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় চট্টগ্রামের একটি আদালত। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।

[atn_photocard]
আরো