ইউনিয়ন ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, ১৪৮ কর্মকর্তা চিহ্নিত

কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ২০ হাজার ৮৩১ দশমিক ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। ২৮৯টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এই ঋণ ছাড় করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, যাচাই-বাছাই না হওয়ায় এটি এখন খেলাপি ঋণ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে এ ঘটনায় দায়ী ১৪৮ কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন ব্যাংকটির সাবেক বেশ কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। সেই তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

এ ছাড়া ক্ষমতার পালাবদলে ইউনিয়ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) জমা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই দুদক থেকে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়দায়িত্ব খুঁজতে মাঠে নেমেছে একটি অনুসন্ধানকারী দল।

জানতে চাইলে অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, ইউনিয়ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটা অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দিয়েছে। গোয়েন্দা অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ইতোমধ্যেই প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে কমিশনের অনুমোদক্রমে দায়ী কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

দুদকে পাঠানো ওই চিঠির সংক্ষিপ্ত বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিনিয়োগ ও অন্যান্য বিষয়ে সংঘটিত গুরুতর অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তালিকা।

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ

দায়ী কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এমডি এ বি এম মোকাম্মেল হক চৌধুরী, সাবেক এমডি আলী নেওয়াজ, সাবেক এফএভিপি মো. মুনিরুল ইসলাম, সাবেক এসভিপি কাজী আবুল মনজুর, সাবেক ভিপি আবু কাউছার, সাবেক এভিপি মো. শাহরিয়ার রউফ, সাবেক এভিপি মোহাম্মাদ সিরাজুল কবির, সাবেক এসভিপি সাজ্জাদ করিম, সাবেক ভিপি রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী, সাবেক এসভিপি মো. আলী নওশাদ চৌধুরী, সাবেক এফএভিপি মো. এরফান আলী, সাবেক এসভিপি এম রেজাউল করিম, সাবেক ভিপি মোহাম্মাদ আবুল কাসেম, সাবেক এফএভিপি মো. এনামুল ইসলাম, সাবেক এফএভিপি সৈয়দ আবদুল্লাহ আল মাসুম, সাবেক এভিপি এরফানুল হক হাক্কানি, সাবেক এভিপি এনামুল ইলাহী, সাবেক এসভিপি ফৌজিয়া রহমান, সাবেক এসপিও ফাতেমা নাসরিন, সাবেক পিও মো. আব্দুল কাদের, সাবেক এসইভিপি মো. নজরুল ইসলাম মুন্সি, সাবেক এসএভিপি মো. বশির উদ্দিন সিকদার, সাবেক এভিপি কাজী মো. ইয়াকুব, সাবেক এফএভিপি শাহ মো. গোলাম সরোয়ার চৌধুরী, সাবেক এভিপি রেজাউল হক, সাবেক এভিপি নন্দিত রহমান তাজবী, সাবেক এফএভিপি নিয়াজ মোহাম্মাদ খান, সাবেক এসএভিপি মো. মনসুর আহমেদ, সাবেক এসএভিপি মো. হাসান রাশেদুর রহমান, সাবেক এসপিও সুমিত দাস, সাবেক এভিপি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, সাবেক এসপিও বিলকিস আক্তার, সাবেক পিও আরাফাত আহমেদ, সাবেক জেও মো. ইউসুফ আলী, সাবেক এফএভিপি তৌহিদুল ইসলাম, সাবেক এসপিও মো. কামরুল ইসলাম, সাবেক এভিপি মো. নুরুল কবীর, সাবেক এসপিও মো. সালেকুর রহমান, সাবেক এসএভিপি মো. আবু মুছা, সাবেক এসপিও মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, সাবেক এফএভিপি মো. রফিকুল ইসলাম ইসলামাবাদী, সাবেক এভিপি মো. আব্দুল মজিদ, সাবেক এসও মো. সোহানুর রহমান খান, সাবেক সিনিয়র অফিসার শাহ মো. মাহতাবুদ্দিন আল–মামুন, সাবেক এসইভিপি সাইফুল আজম, সাবেক এভিপি মুহাম্মদ রাশিদ সহিদ, সাবেক এভিপি আবুল হাসান মো. তারেক, সাবেক অফিসার মো. আব্দুর রহিম, সাবেক এভিপি নাহিয়ান রহমান, সাবেক পিও সুধি সুলতানা।

সাবেক এফএভিপি মাহফুজুর রহমান খান, সাবেক এসও কে এ বি এম ওয়াহিদ ইকবাল সামি, সাবেক এভিপি মাহবুব ইমরান চৌধুরী, সাবেক এসপিও আমিন জামায়েল খন্দকার, সাবেক এসপিও মোস্তফা মাহমুদ মাহিন, সাবেক জেও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সাবেক ভিপি আব্দুল মালেক, সাবেক ভিপি মো. আব্দুল হালিম, সাবেক এফএভিপি আয়েশা হুমায়ারা, সাবেক পিও জাকির হোসাইন, সাবেক এভিপি শওকত ওসমান চৌধুরী, সাবেক ভিপি মোহাম্মদ খালেদ হোসেন, সাবেক এসএভিপি মো. আবুল খায়ের, সাবেক পিও মো. আবু বকর সিদ্দিক চৌধুরী, সাবেক এসও ফরিদুল হক চৌধুরী, সাবেক এসভিপি ফিরোজ মাহমুদ, সাবেক এভিপি শিল্পি দত্ত, সাবেক এফএভিপি মনিকা চৌধুরী, সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার মো. শওকতুর রহমান, সাবেক এসিও মুসতাক আহমেদ, সাবেক জেও মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম, সাবেক এসপিও মোহাম্মদ জহিরুল আলম, সাবেক এসএভিপি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, সাবেক এসপিও আবু সায়েম মো. নাঈম উদ্দীন, সাবেক অফিসার এ এস এম নুরুল আফসার, সাবেক অফিসার মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক পিও সৈকত দাস, সাবেক অফিসার মো. আলমগীর, সাবেক সিনিয়র অফিসার আহমেদ শাফা, সাবেক এভিপি শফিকুল আলম শফিক, সাবেক এসপিও শাহনেওয়াজ চৌধুরী, সাবেক এসও মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক এসপিও মো. মইনুল হাসান, সাবেক পিও মকসুদ করিম চৌধুরী, সাবেক কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দীন চৌধুরী, সাবেক অফিসার মো. ফখরুদ্দীন, সাবেক এসও জসিম উদ্দীন, সাবেক এসপিও মো. কামরুল আজাদ, সাবেক এসপিও মো. আল মুসতানসির, সাবেক এসও মো. হাসান শহীদ সরওয়ার উদ্দিন, সাবেক এফএভিপি এএইচএম আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, সাবেক এসও মোহাম্মদ মিছবাহুল হক, সাবেক পিও মো. বোরহান উদ্দিন, সাবেক অফিসার মো. ফারুখ খান চৌধুরী, সাবেক এসও সাইফুল আলম চৌধুরী, সাবেক এসপিও ইমরান দিদার, সাবেক এসপিও মোসলেই উদ্দীন, সাবেক পিও আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক পিও রয়েল বড়ুয়া, সাবেক এসও মো. আবু নাইম চৌধুরী।

এ ছাড়া রয়েছেন সাবেক পিও ফোরকান উদ্দীন, সাবেক পিও মোহাম্মদ মাসুদ, সাবেক এসপিও মো. ইকবাল হোসাইন, সাবেক এসও মোহাম্মাদ বেলাল হোসেন চৌধুরী, সাবেক এসপিও মো. মিনহাজুর রহমান, সাবেক পিও হেলাল আহমেদ খান, সাবেক এসপি মোহাম্মাদ মোরশেদুল আলম, সাবেক পিও মো. বেলাল চৌধুরী, সাবেক পিও মো. বাহারুল ইসলাম, সাবেক এসও মোহাম্মদ আকরামুল হক, সাবেক এভিপি মো. বায়োজিদ হাসান, সাবেক সিনিয়র অফিসার মো. জামাল উদ্দিন, সাবেক পিও মুহাম্মদ আলী, সাবেক এফএভিপি ওমর ফারুক, সাবেক এমডি আব্দুল হামিদ মিয়া, সাবেক এমডি সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সালেহ, সাবেক এএমডি এসএএম সলিমুল্লাহ, সাবেক ডিএমডি মো. হাবিবুর রহমান, সাবেক এএমডি হাছান ইকবাল, সাবেক ডিএমডি শফিউদ্দীন আহমেদ, সাবেক ডিএমডি মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক ডিএমডি মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক ডিএমডি মো. আজাদুর রহমান, সাবেক ইভিপিও হেড অবআরএমডি এন্ড আইএডি গোলাম মোস্তাফা, সাবেক এসইভিপিও হেড অব আইসিসিডি জয়ন্ত কুমার মন্ডল, সাবেক এসভিপিও হেড অব ট্রেজারি আব্দুল হান্নান খান, সাবেক এসভিপিও কোম্পানি সেক্রেটারি এন্ড হেড অব এইসআরডি মনছুর আহমদ, সাবেক ভিপিও হেড অব আইএডি গাজী মাহমুদ হাছান, সাবেক ভিপিও হেড অব আইডি মো. রুহুল আমিন, সাবেক হেড অব এফএডি এন্ড সিএফও ইস্কান্দর পারভেজ, সাবেক ভিপিও হেড অব আইডি মো. সালাহ উদ্দীন, সাবেক এসএভিপিও ইন-চার্জ অব আরএমডি মোহাম্মেদ মাহফুজুর রহমান, সাবেক এভিপি নুরুল ইসলাম, সাবেক এভিপি মো. মাহবুব আলম, সাবেক এভিপি (আইএডি) আব্দুল মতিন, সাবেক এভিপি মোহাম্মাদ তৌহিদুল মাওলা, সাবেক এভিপি মো. মাহবুবুল আলম, সাবেক এফএভিপি একেএম মোরশেদ আলম, সাবেক এফএভিপি শঙ্কর কুমার রায়, সাবেক এফএভিপি মো. নুরুজ্জামান শুভ্র, সাবেক এসপিও মো. আরিফুজ্জামান, সিডিসিএস; সাবেক এসপিও মো. আবছারুল আলম, সাবেক সিনিয়র অফিসার নিশাত নাসরিন, সাবেক সিনিয়র অফিসার তাহমিনা আকতার, সাবেক সিনিয়র অফিসার নাজিয়া আমিন, সাবেক অফিসার ছোটন সিং, সাবেক অফিসার ওয়াহিদ হোসাইন সিফাত, সাবেক অফিসার মো. আবু হুরায়রা চৌধুরী।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে যা আছে
প্রতিবেদনে ১৪৮ কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশ ও সহযোগিতায় সংঘবদ্ধভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসিরপ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া প্রাপ্ত তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুমিত হয় যে তারা আইনি প্রক্রিয়া এড়ানোর উদ্দেশ্যে দেশত্যাগের প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকতে পারেন, যা তদন্ত কার্যক্রম ও অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ, তাদের অর্জিত সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক এবং সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করা একান্ত জরুরি। অন্যথায়, তছরুপ করা অর্থ গোপন, স্থানান্তর বা বেহাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র, ব্যাংক ও সাধারণ আমানতকারী অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

চিঠিতে দুদককে বেশ কয়েকটি অনুরোধ করে ইউনিয়ন ব্যাংক বলেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও দায়িত্বে চরম অবহেলার মাধ্যমে ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসির প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা তদন্তপূর্বক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত) এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে তছরুপকৃত অর্থ উদ্ধারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; তদন্তের স্বার্থে ও অর্থ উদ্ধারের নিশ্চয়তার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সব ব্যাংক হিসাবসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি দ্রুত জব্দ/ক্রোক করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; গুরুতর অনিয়ম ও আর্থিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যাতে আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে বিদেশে পালাতে না পারেন, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।

আরো