গ্রীন ডেল্টার তহবিলে বড় অঙ্কের অর্থের হদিস নেই

কারসাজি ও গোঁজামিলের মাধ্যমে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে তহবিল থেকে সাড়ে ৮শ’ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নন-লাইফ বীমা কোম্পানি গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কোম্পানিটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও হিসাব-নিকাশে নানা অসঙ্গতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ তহবিল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এসব নথি পর্যালোচনায় আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের অসঙ্গতি ও গোঁজামিলের তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কারসাজি করে ইক্যুইটি বৃদ্ধির হিসাব দিয়ে তহবিল থেকে উধাও করা হয়েছে ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ইক্যুইটি বৃদ্ধির এই কারসাজিতে পুনর্মূল্যায়ন করে সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি করা হয় ১৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এই সম্পদ বিক্রি হওয়ার আগেই সম্পদ পুনর্মূল্যায়িত এই রিজার্ভ থেকে ৫৪ কোটি টাকা ডিভিডেন্ড তুলে নেয়া হয়।

বেআইনিভাবে অন্যান্য খাতে অগ্রিম বাবদ পরিশোধ দেখানো হয় ২২৫ কোটি টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে ১৭১ কোটি টাকা। অপরদিকে মুনাফা থাকার পর ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয় ২৬৩ কোটি টাকা। হিসাবের গোঁজামিল দিয়ে কমানো হয় ইক্যুইটির ৫৪ কোটি টাকা ও ক্যাশ-ফ্লো’র ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

এছাড়াও গ্রাহকের জমা করা প্রিমিয়াম, ভ্যাট ও ট্যাক্সের টাকা গোপন করা, অবৈধ ব্যয়, অতিরিক্ত কমিশন প্রদান, বাকি ব্যবসা, প্রিমিয়াম হার লঙ্ঘন, পুনর্বীমা না করে ব্যবসা পরিচালনা করা ও মুখ্য নির্বাহীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে দেয়া হয়েছে আর্থিক সুবিধা।

তবে প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ নিরীক্ষকের কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়া এবং বিশেষ নিরীক্ষক ও তদন্ত দলকে তথ্য না দেয়ায় আড়ালেই থেকে গেছে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র অনিয়ম-দুর্নীতির এসব ঘটনা।

তহবিল থেকে উধাও ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা

২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল ১৯ বছরে গ্রীন ডেল্টা মুনাফা করে ১ হাজার ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই টাকা থেকে আয়করের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ২৭৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ও ডিভিডেন্ড প্রদান করা হয় ৩৬৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তহবিলে উদ্বৃত্ত থাকে ৩৬৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

এছাড়াও এই সময়ে কোম্পানিটি ব্যাংক ঋণ নিয়েছে ২৬৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, পুনর্মূল্যায়ন করে সম্পদ বৃদ্ধি করা হয়েছে ১৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং “অন্যান্য খাতে অগ্রিম” দেখানো হয়েছে ২২৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ইক্যুইটি বৃদ্ধির হিসাবে এসব যোগ করা হলে ইক্যুইটি বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

অথচ ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে ইক্যুইটি বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ৬৩৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ ইক্যুইটি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

হিসাব বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুসারে সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করে সম্পদের মুল্য বৃদ্ধির অর্থ আদায় না হওয়া পর্যন্ত আয় হিসাবে দেখানো হিসাব নীতিমালার পরিপন্থী। আবার কোনো বিস্তারিত বিবরণ ছাড়া অন্যান্য খাতে অগ্রিম প্রদান করা হিসাব নীতিমালার পরিপন্থী। এটি হিসাবের কারসাজি। আর এই কারসাজির উদ্দেশ্য হতে পারে তহবিল থেকে টাকা সরিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করা।

“অন্যান্য খাতে অগ্রিম” প্রদান ২২৫ কোটি টাকা, অথচ খাত নেই

অন্যান্য খাতে অগ্রিম দেখানো হয়েছে ২২৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অথচ কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন খাতে এসব টাকা অগ্রিম দেয়া হয়েছে তার কোন বিস্তারিত বিবরণ নেই গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে।

২০০৭ সালে এই অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২২৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

হিসাব বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনির্দিষ্ট খাত ছাড়া এতো বড় অংকের অগ্রিম দেখানোর কোন সুযোগ নেই। এই অগ্রিম প্রদানের উদ্দেশ্য হতে পারে তহবিল থেকে অর্থ বের করে আত্মসাৎ করা।

মুনাফার পরও ব্যাংক ঋণ ২৬৩ কোটি টাকা: সুদ পরিশোধ ১৩৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা

বছরের পর বছর বড় অংকের মুনাফা করার পরও ২৬৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ নেয় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। আর এই ঋণের বিপরীতে ১৭ বছরে সুদ পরিশোধ করেছে ১৩৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

মুনাফা থাকার পরও ব্যাংক ঋণ অপ্রয়োজনীয়, অস্বাভাবিক। হিসাব বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অংকের মুনাফা থাকার পরও ব্যাংক ঋণ নেয়া অস্বাভাবিক। মূলত তহবিল থেকে টাকা তুলে নেয়ার কৌশল হতে পারে এই ব্যাংক ঋণ।

গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স প্রথম ব্যাংক ঋণ নেয় ২০০৮ সালে। ওই বছরে কোম্পানিটির ঋণ ছিল ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর প্রতি বছরই এই ঋণ বেড়ে ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২৬৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

এগারো বছরে অতিরিক্ত ব্যয় ১৭২ কোটি টাকা

নন-লাইফ বীমা কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনার জন্য কত টাকা ব্যয় করবে তার একটি সীমা রয়েছে। ব্যয়ের এই সীমা বেধে দেয়া হয়েছে শেয়ার হোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায়। যাতে কোনো কোম্পানি যেমন ইচ্ছা তেমন ব্যয় করতে না পারে। কিন্তু গ্রীন ডেল্টা বছরের পর বছর ধরে এই ব্যয়সীমা মানেনি।

গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল এই ১১ বছরে মোট ১৭১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে। অতিরিক্ত ব্যয়ের এই হিসাব করা হয়েছে ১৯৫৮ সালের প্রবিধানমালা অনুসারে।

১৭১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের মধ্যে ২০০৭ সালে অতিরিক্ত ব্যয় করে ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, ২০০৮ সালে ৫ কোটি ৪৯ লাখ, ২০০৯ সালে ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ২০১০ সালে ১২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ২০১১ সালে ১৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ১৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

ফারজানা চৌধুরী মুখ্য নির্বাহী পদে যোগদান করেন ২০১৩ সালে। এর পরের বছরগুলোর অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২০১৩ সালে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ২০ কোটি ১২ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে ২২ কোটি ৯১ লাখ টাকা, ২০১৬ সালে ২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা, ২০১৭ সালে ২৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

অর্থাৎ কোম্পানিটির অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।

আইডিআরএ’র মতে, অতিরিক্ত ব্যয় অবৈধ। কিন্তু গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত ব্যয় করলেও শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইডিআরএ।

২০১৮ সালের প্রবিধানমালা সংশোধন করে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অনুমোদিত সীমা গড়ে ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। এরপরে গ্রীন ডেল্টা আর অতিরিক্ত ব্যয় করেনি। তবে ১৯৫৮ সালে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের প্রবিধানমালা অনুসারে হিসাব করা হলে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল এই ৮ বছরে গ্রীন ডেল্টা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ৩৯৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

হিসাবে গড়মিলে ইক্যুইটি কমে গেছে ৫৪ কোটি টাকা

আর্থিক প্রতিবেদনে গোঁজামিলের হিসাব দিয়ে ইক্যুইটি কমে গেছে ৫৪ কোটি টাকা। এই গোঁজামিল দেয়া হয়েছে ৩১ ডিসেম্বর ও পরের বছরের ১ জানুয়ারির হিসাবে।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৮ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে ২০১৮ সাল শেষে ইক্যুইটির পরিমাণ ছিল ৬২৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। কিন্তু পরবর্তী বছর ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের ইক্যুইটির সেই পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৫৭৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক দিনের হিসাবে গোঁজামিল দিয়ে ৫৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার ইক্যুইটি কমানো হয়। এভাবে হিসাব প্রদর্শন বেআইনি।

সম্পত্তি বিক্রি না করেই পুনর্মূল্যায়িত রিজার্ভ থেকে ৫৪ কোটি টাকার ডিভিডেন্ড প্রদান

আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুসারে পুনর্মূল্যায়িত সম্পত্তির রিজার্ভের অর্থ আদায় না হওয়া পর্যন্ত ওই রিজার্ভ থেকে মুনাফা বা ডিভিডেন্ড প্রদানের সুযোগ নেই। অথচ বছরের পর বছর এমন অনাদায়ি রিজার্ভ থেকে ডিভিডেন্ড প্রদান করেছে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স।

কোম্পানিটি ২০১২ সালে সম্পত্তি পুনর্মূল্যায়ন করে ১৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা রিজার্ভ দেখায়। এরপর ওই সম্পত্তি বিক্রি না করেই এই অনাদায়ী রিজার্ভ থেকে শেয়ার হোল্ডারদের ৫৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকার ডিভিডেন্ড প্রদান করে। এই ডিভিডেন্ড প্রদান করা হয়েছে ২০১৩ সাল থেকে ২০২৫ সালে।

প্রিমিয়াম আয়ের হিসাব গোপন করে আত্মসাৎ ৪২ কোটি টাকা

ব্যাংকে জমা করা প্রিমিয়াম আয়ের ১৭ কোটি ৯৮ লাখ ৫৫২ টাকা ও ব্যাংকে জমা থাকা ২৩ কোটি ৭৭ লাখ ৮৭ হাজার ৬শ’ টাকার হিসাব আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদর্শন না করে গোপন করার তথ্য পাওয়া গেছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম জমার ব্যাংক একাউন্টে জমা হয় ৪৩২ কোটি ১২ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪ টাকা। এর মধ্যে- ভ্যাটের ২৬ কোটি ৬৬ লাখ ৫৯ হাজার ৫০৮ টাকা, স্ট্যাম্প ডিউটি ১০ কোটি ৮ লাখ ৭৩ হাজার ২১৩ টাকা ও চেক রিটার্নে ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৩ হাজার ২৬৭ টাকা বাদ দেয়া হলে ব্যাংকে জমা প্রকৃত প্রিমিয়াম জমার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭৯ কোটি ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪১ টাকা।

নিয়ম অনুসারে, ব্যাংকে জমা হওয়া নিজস্ব প্রকৃত প্রিমিয়াম আয়ের সাথে ডিপোজিট হিসাবে জমা রাখা প্রিমিয়ামের যোগ বিয়োগ করে ডাইরেক্ট প্রিমিয়াম হিসাব করতে হয়।

এই হিসাবে গ্রীন ডেল্টার ব্যাংকে জমা করা প্রকৃত সরসারি প্রিমিয়াম আয়ের ৩৭৯ কোটি ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪১ টাকা সাথে আগের বছর ২০১৯ সালে ডিপোজিট প্রিমিয়ামের ২৩ কোটি ৬৯ লাখ ৯ হাজার ৮২৬ টাকা প্রিমিয়াম হিসাবে যোগ করে ও ২০২০ সালের প্রিমিয়াম ডিপোজিট ২৫ কোটি ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯২ টাকা বাদ দিলে গ্রীন ডেল্টার সরাসরি প্রিমিয়াম আয় দাঁড়ায় ৩৭৯ কোটি ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪১ টাকা।

যার সাথে সরকারি ব্যবসার (পিএসবি) ৬ কোটি ১৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪৫১ টাকা হিসাবে ধরে গ্রীন ডেল্টার গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের পরিমাণ হওয়ার কথা ৩৮৫ কোটি ৬৫ লাখ ৪৯ হাজার ২৯২ টাকা।

অথচ গ্রীন ডেল্টা আর্থিক প্রতিবেদনে গ্রস প্রিমিয়াম আয় দেখিয়েছে ৩৬৭ কোটি ৬৭ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রিমিয়াম আয়ের তথ্য গোপন করেছে ৬ কোটি ১৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪৫১ টাকা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২২ সালে বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ঢাকা ব্যাংক মহাখালি ব্রাঞ্চে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ওভারড্রাফট হিসাব নং ২২৫১৭৫০০০০৪৫৬ -তে ঋণ ২১ কোটি ২২ লাখ ২৬ হাজার ৬৭৩ টাকা। অথচ আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ২৩ কোটি ১৪ হাজার ২৭৩ টাকা।

অর্থাৎ একাউন্টের ১ কোটি ৭৭ লাখ ৮৭ হাজার ৬শ’ টাকা আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাবে দেখানো হয় নাই।

ঠিক একইভাবে কোম্পানিটির যমুনা ব্যাংক ধানমন্ডি শাখার হিসাব নম্বর ১০০১০০১৩৪৯৫৮০ নং একাউন্টে জমা রয়েছে ৭৭ কোটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৯শ’ ৪০ টাকা। আর গ্রীন ডেল্টা আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাবে দেখিয়েছে ৫৫ কোটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৯৪০ টাকা।

এই হিসাবে ২২ কোটি টাকার কোনো হিসাব আর্থিক প্রতিবেদনে নেই।

হিসাবের গোঁজামিলে ক্যাশ-ফ্লো থেকে ঘাটতি ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে ২০১৭ সালের ক্যাশ-ফ্লো স্টেটমেন্টে (নগদ প্রবাহ বিবরণীতে) বছর শেষে প্রকৃত নগদ বৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়ার কথা ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, কিন্তু তা হয়েছে ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

গেল ১৯ বছরের মধ্যে সাড়ে ১৬ বছরই গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সে কোন বিশেষ নিরীক্ষা হয়নি। ২০১৬ সালে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। নিরীক্ষার মেয়াদ ঠিক করা হয় ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নির্দেশ দিয়ে বিশেষ নিরীক্ষার এই কার্যক্রম স্থগিত করে দেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তৎকালিন উপসচিব সাঈদ কুতুব স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে মন্ত্রীর এই নির্দেশ আইডিআএ’র চেয়ারম্যানকে জানানো হয়। এই চিঠি দেয়া হয় ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে। এই নিরীক্ষা আর হয়নি।

পরে ২০২২ সালের ২১ জুলাই বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। এই নিরীক্ষার মেয়াদ ঠিক করে দেয়া হয় ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের মে পর্যন্ত। এর পরে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর আবারো বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। এই বিশেষ নিরীক্ষার মেয়াদ ঠিক করে দেয়া হয় ১ জানুয়ারি ২০২২ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ সাল পর্যন্ত। এই হিসেবে ১৯ বছরের মধ্যে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সে বিশেষ নিরীক্ষা করা হয় মাত্র আড়াই বছরের বাকি সাড়ে ১৬ বছরের কোনো নিরীক্ষা হয়নি গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সে।

২০১৬ সালে গ্রীন ডেল্টার বিশেষ নিরীক্ষার কার্যক্রম স্থগিতের পর ২০২২ সালের ২১ জুলাই ২য় বার বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। এই নিরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য প্রিমিয়াম জমার ৩টি ব্যাংক হিসাবসহ নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যাংক হিসাব পরিচালনা সংক্রান্ত ৬৪ নং সার্কুলার যথাযথভাবে পরিপালন করা হয়েছে কি না তা যাচাই করা।

এই বিশেষ নিরীক্ষার সময় ঠিক করা হয়েছিল ২০১৯ সালের আগষ্ট থেকে ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত। কিন্তু বিশেষ নিরীক্ষকদের চাহিদা অনুসারে তথ্য না দেয়া পুর্নাঙ্গ নিরীক্ষা করতে পারেনি নিরীক্ষক দল।

এর ২ বছর পর ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেয় আইডিআরএ। ২০২২ সালের গ্রীন ডেল্টার ব্যবসায়ী কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে এই বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। এই বিশেষ নিরীক্ষার সময় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ ধরনের তথ্য দেয়নি।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তথ্য না দেয়ার কারণে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। ফলে এসব বিশেষ নিরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রকৃত তথ্য উঠে আসেনি।

শাস্তি দেয়ার সুপারিশ তদন্ত দলের: আইডিআরএ করল সতর্ক

২০২২ সালের ২৮ জুলাই ২ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে আইডিআরএ। এই কমিটি প্রধান মোহাম্মদ মোর্শেদুল মুসলিম। গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের বাড্ডা শাখার প্রধান তাইয়েব মহসিনের অভিযোগের ভিত্তিতে এই কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি ওই বছর ১৫ সেপ্টেম্বর আইডিআরএ চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত দল ১০ ধরনের তথ্য চায় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের কাছে। কিন্তু গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স অধিকাংশ তথ্য তদন্ত দলকে দেয়নি। পরবর্তীতে তদন্ত দল গ্রীন ডেল্টা থেকে তথ্য না পেয়ে ইউএমপি থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্ট করে। কিন্তু ইউএমপির সিস্টেমেও গ্রীন ডেল্টা থেকে তথ্য না দেয়ায় তদন্ত করতে ব্যর্থ হয় আইডিআরএ’র তদন্ত দল।

এরপরও যেসব তথ্য তদন্ত দলের হাতে আসে তা পর্যালোচনা করে বাকী ব্যবসা, আইনি লঙ্ঘন করে কম প্রিমিয়ামে পলিসি করানো, অবৈধ কমিশন প্রদান, আইডিআরএ’কে তথ্য না দেয়ার প্রমাণ পায় তদন্ত দল। তদন্ত দল আইন লঙ্ঘন করে ব্যবসা পরিচালনার জন্য গ্রীন ডেল্টার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ায় সুপারিশ করে।

তদন্ত দলের সুপারিশ পাশ কাটিয়ে আইডিআরএ শুনানীতে সিদ্ধান্ত হয় সতর্ক করার। আইডিআরএ’র সদস্য নন-লাইফ মো. দলিল উদ্দিনের সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০২২ সালের ১ নভেম্বর।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরীর মুঠোফোনে এবং হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে বীমা কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা ই-মেইলের মাধ্যমে লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর পরামর্শ দেয়। তবে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া মেনে লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর পরও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব মেলেনি। ফলে এ বিষয়ে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য সংযোজন করা সম্ভব হয়নি।

অপরদিকে, এ বিষয়ে জানতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি তথ্যভিত্তিক বা ডাটাভিত্তিক উল্লেখ করে লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর পরামর্শ দেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তীতে সংস্থার চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও সেখান থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মতামত বা সাড়া পাওয়া যায়নি।

এসব বিষয়ে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)’র নিরীক্ষা চর্চা পুনরীক্ষণ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. তারেক কামাল এফসিএ ইন্স্যুরেন্স বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে কোন ধরণের তথ্য যেমন গোপন করার সুযোগ নেই; তেমনি কোন ধরণের অসঙ্গতি বা গড়মিল তথ্য দেয়ার সুযোগ নেই।

আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হিসাব মান লঙ্ঘন করা হলে ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন, ২০১৫ অনুসারে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি এবং অডিটরের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান এফআরসি’র নির্বাহী পরিচালক মো. তারেক কামাল।

আরো