অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে টাকা রেখে দিশাহারা তারা
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইউনিয়নের উদং মধুপুর শেয়ালধরা বাজারে অগ্রণী ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটকে ঘিরে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর করার নামে ভুয়া রসিদ দেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকদের অজান্তে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন ও স্থানান্তরের অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আউটলেটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও ব্যাংকের নাম ও সাইনবোর্ড ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের বড় একটি অংশ এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এই অভিযোগের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে শামছুন্নাহার, শোভা খাতুন ও মফিজউদ্দিনের মতো কয়েকজন গ্রাহকের গল্প। তাদের প্রত্যেকের স্বপ্ন আলাদা। কিন্তু তিনটি গল্পের শেষ এসে মিশেছে একই জায়গায়—ব্যাংকে রাখা টাকা আর নেই, অথচ সেই টাকা ফেরত পাওয়ার অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না।
নারায়ণপুর গ্রামের শামছুন্নাহারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল নিজেদের একটি বাড়ি। এমন একটি ঘর, যেখানে স্বামী-সন্তান নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যাবে। এই স্বপ্নের জন্যই তার স্বামী সুজন মিয়া সৌদি আরবে পাড়ি জমান। বিদেশে যাওয়ার জন্য পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছে। সেখানে গিয়ে কষ্ট করে উপার্জন করা টাকা দেশে পাঠাতে শুরু করেন সুজন মিয়া। সেই টাকা জমিয়ে রাখতেন শামছুন্নাহার।
ঘরে এত টাকা রাখা নিরাপদ মনে হয়নি তার। তাই অগ্রণী ব্যাংকের শেয়ালধরা বাজারের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে নতুন ঘর তৈরির স্বপ্নে ২৪ লাখ টাকা জমা দেন। তাকে বলা হয়েছিল, টাকা দিয়ে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র করা হবে। হাতে দেওয়া হয়েছিল রসিদ। কিন্তু আউটলেটের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মূল ব্যাংক শাখায় গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার নামে ওই সঞ্চয়পত্রের কোনো তথ্য নেই।
শামছুন্নাহার বলেন, ‘আমার স্বামী এত কষ্ট কইরা বাইরে গেছে। ঋণ কইরা বাইরে পাঠাইছি। পরে কিছু টাকা কামাইছে, আমরা একটা বাড়িঘর করমু, এই জন্যই টাকা রাখছিলাম। ব্যাংক নিরাপদ মনে কইরা ২৪ লাখ টাকা রাখছিলাম। এখন আমরা জানি না এই টাকা কই পাব।’
অন্যদিকে ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য জমি ও গরু-ছাগল বিক্রি এবং কিছু জমি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করেছিলেন মফিজউদ্দিন। প্রায় পৌনে ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখেন তিনি। তার কাছে ব্যাংক ছিল নিরাপদ জায়গা, কারণ বাড়িতে টাকা রাখলে চুরির ভয় ছিল।
মফিজউদ্দিন বলেন, ‘ছেলেরে বিদেশে পাঠাবো। জমিজমা, গরু-ছাগল বিক্রি করি। কিছু জমি বন্ধক রেখে পৌনে ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখি। ভাঙা ঘরবাড়ি, চুরির ভয়। ব্যাংক নিরাপদ মনে কইরা রাখছিলাম। ব্যাংক থেকেই আমার টাকা চুরি হয়ে গেল।’
উদং মধুপুর গ্রামের শোভা খাতুন পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। মাসের বেতন থেকে সংসারের খরচ মিটিয়ে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছিলেন। তার স্বামী অসুস্থ, কর্মহীন। সংসারে আছে ছোট একটি ছেলে, যাকে মাদরাসায় পড়াচ্ছেন তিনি।
সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই নিজের কষ্টের টাকা জমিয়েছিলেন শোভা। প্রথমে ২ লাখ, পরে আরও ৬০ হাজার এবং এরপর ২০ হাজার টাকা জমা দেন। সব মিলিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
এই টাকা পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে মূল ব্যাংকে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার জমা দেওয়া টাকার কোনো নথি নেই এবং হাতে থাকা রসিদটিও ভুয়া।
শোভা বলেন, ‘গার্মেন্টসে চাকরি কইরা তিল তিল কইরা এই কয়টা টাকা জমাইছি। আমার একটা ছোট ছেলে আছে, এই ছেলেরে মাদ্রাসায় ভর্তি করাইছি। আমার স্বামী অসুস্থ, কর্মহারা। এই টাকাটাই আমার জীবন, এই টাকাটাই আমার মরণ।’
তার আকুতি, টাকা ফিরে পেলে ছেলের পড়াশোনা চালাবেন এবং সংসারটা কোনোভাবে টিকিয়ে রাখবেন।
চরকাশিনগর গ্রামের আনসার সদস্য মো. সোহেল মিয়ার গল্পও প্রায় একই। সাড়ে ৯ লাখ টাকা হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ শুধু ভুয়া সঞ্চয়পত্র বা এফডিআর নিয়ে নয়। মালয়েশিয়াপ্রবাসী কালাম মিয়ার ব্যাংক হিসাব থেকে তার স্ত্রীর অজান্তে ১৭ লাখ টাকা উত্তোলন ও স্থানান্তরের অভিযোগও উঠেছে।
গ্রাহকদের দাবি, এভাবে বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আউটলেটটির সামনে সংবাদ সম্মেলন করে ভুক্তভোগীরা এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। লিখিত বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীর আলম। তারা উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছেন। দ্রুত টাকা ফেরত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অগ্রণী ব্যাংকের কালিগঞ্জ বাজার শাখার অধীন এই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটির স্বত্বাধিকারী ‘পড়শী সেবালয়’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর মালিক মো. মাজহারুল ইসলাম ওরফে মিজান।
২০২০ সালের জুনে কার্যক্রম শুরু করা আউটলেটটির গ্রাহক ছিলেন প্রায় ২ হাজার ৮০০ জন। বিভিন্ন অসংগতি ও অনিয়মের কারণে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ২১ জুন আউটলেটটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পরও ব্যাংকের সাইনবোর্ড ও নাম ব্যবহার করে গোপনে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে গত ১৮ আগস্ট কালিগঞ্জ শাখার কর্মকর্তারা গিয়ে আউটলেটটির সাইনবোর্ড অপসারণ করেন।
অগ্রণী ব্যাংকের কালিগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, আউটলেটটি বন্ধের সময় সেখানে গ্রাহকদের আনুমানিক ১ কোটি ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা আমানত ছিল। তবে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ইস্যু কিংবা এফডিআর করার কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন ছিল না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের তদন্তে প্রাথমিক অনুসন্ধানে গ্রাহকদের প্রায় ৬২ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকের নথিবহির্ভূত এই অর্থের দায় সংশ্লিষ্ট এজেন্ট মালিককে বহন করতে হবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে তদন্তে একটি হিসাব থেকে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রায় ৪৬ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরের মতো কাগজপত্র এবং প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা রসিদের মাধ্যমে জমা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬২ লাখ টাকার অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে আউটলেটটির স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম ওরফে মিজান দায় অস্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ইস্যুর কোনো অনুমোদন তাদের ছিল না। সঞ্চয়পত্রের নামে কাগজপত্র কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন। তিনি আউটলেটের ব্যবস্থাপক মাজাহারুল ইসলাম ওরফে সোহেলকে দায়ী করেন।
জানা গেছে, সোহেল বর্তমানে মালয়েশিয়ায় আত্মগোপনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে এবং মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে।