এনআরবিসিতে পর্ষদের হস্তক্ষেপে বাড়ছে সংকট খেলাপি ঋণের হার ছাড়িয়েছে ২১%
সাবেক চেয়ারম্যান এস এম পারভেজ তমালের সময়ের নানা অনিয়মের পর ঘুরে দাঁড়াতে এনআরবিসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে নতুন পর্ষদে থাকা ছয় স্বতন্ত্র পরিচালকের একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ব্যাংকটির কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম খানকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনায় ব্যাংকটির সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম খানকে চাকরিচ্যুত করে এনআরবিসি ব্যাংক। চাকরিচ্যুতির কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও চাকরি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এনআরবিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালকরা একের পর এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়ে আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে তাদের ইচ্ছামতো ব্যাংক চালাচ্ছেন। অযোগ্য অনেককে পদায়ন করা হয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্যের পাশাপাশি চলছে ব্যাংকের বদলি বাণিজ্যও। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করায় শেষ পর্যন্ত ডিএমডিকেও চাকরি হারাতে হলো। এভাবে কোনো ব্যাংক চলতে পারে না। এমডি সাহেব এখন চাকরি বাঁচাতে পরিচালকদের ইশারায় কাজ করছেন। যদিও এর আগে তার কোনো ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালনার রেকর্ড ভালো নয়।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়ার নেতৃত্বে পর্ষদে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল বশর, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, সোনালী ব্যাংকের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল হক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. শফিকুর রহমান, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবুল কালাম আজাদ এবং চার্টার্ড হিসাববিদ মুহাম্মদ এমদান উল্লাহ। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. তৌহিদুল আলম খান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন বছরের মধ্যে ব্যাংকটির ঋণ পোর্টফোলিও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। গত ছয় মাসে নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। খেলাপি ঋণের হার ২১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে আমদানি-রপ্তানি ও প্রবাসী আয় প্রবাহেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতেও ব্যাংকটির জন্য কার্যকর কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বড় অঙ্কের কিছু বিল ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে খাতায় কৃত্রিম মুনাফার চিত্র দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে আর্থিক সূচক ভালো দেখালেও ভবিষ্যতে ব্যাংকের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় গ্রাহকসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতে গ্রাহকদের একটি অংশ অন্য ব্যাংকের দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কা।
পর্ষদের একাংশ ব্যাংকের নীতিগত ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের বাইরে দৈনন্দিন কার্যক্রমে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমডি পদে নিয়মিত কার্যক্রমে স্থবিরতার মধ্যে তুলনামূলক জুনিয়র একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়ায় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি কর্মকর্তাদের। এর প্রভাব পড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবলে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ নিয়ে অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিরা ব্যাংকটির সুশাসন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই পরিস্থিতিতে পর্ষদের একাংশ একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে বিষয়টি ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
নিরীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন: কেপিএমজির মাধ্যমে পরিচালিত ফরেনসিক নিরীক্ষার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধির ঘাটতি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণমূলক সুপারিশ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ওই নিরীক্ষার পর অতীতে ব্যাংকের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জবাবদিহির নামে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে ঋণপত্র ও শাখা পর্যায়ে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ফের দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
অবসরকালীন আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সময়সীমা অনুসরণ না করে পর্ষদের নির্দিষ্ট সদস্যের সুপারিশ বা ওপর মহলের ফোন ছাড়া এসব সুবিধা ছাড় করা হয় না।
ব্যাংকিং খাত-সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে এনআরবিসি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন কাঠামোর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তারা মনে করেন, আমানতকারীদের স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্রুত পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ খান বলেন, পর্ষদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগ থাকলে আর্থিক ঝুঁকির সঙ্গে সুশাসনের ঝুঁকিও যুক্ত হয়। বিশেষ করে ঋণ অনুমোদন, পুনঃতপশিল বা ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তে পর্ষদ প্রভাব বিস্তার করলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে এবং সম্পদের মান খারাপ হতে পারে। সুশাসন দুর্বল হলে সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. তৌহিদুল আলম খানকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনিও কোনো উত্তর দেননি। ফলে ব্যাংকটিতে চলমান অস্থিরত ও কর্মীদের চাকরি হারানো ও বদিলর শঙ্কা নিয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বোর্ড মিটিংয়ে এজেন্ডা না থাকা সত্ত্বেও, ডিএমডি মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম খানকে চাকরিচ্যুত করায় ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার নং ১১-এর ব্যত্যয় ঘটেছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এনআরবিসির পরিচালনা পর্ষদকে শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে। নোটিশের জবাব তিন কার্যদিবসের মধ্যে দেওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা রয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তিকে চাকরিচ্যুত করার বিষয়টি সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখতিয়ারভুক্ত নয়। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু এ ঘটনায় সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তা এরই মধ্যে আবেদন করেছেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। বাংলাদেশ ব্যাংক মুখপাত্র আরও বলেন, ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালকদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ পাওয়া গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা পরিদর্শন ও তদন্ত করে দেখবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের পর্ষদে থাকা উচিত কি না, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা হবে।