অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েল ফুটওয়্যার নিয়ে বিতর্ক
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির লক্ষ্যে রয়েল ফুটওয়্যার পিএলসি সম্প্রতি যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত প্রাথমিক শেয়ার প্রস্তাবের (IQIO) খসড়া প্রসপেক্টাস জমা দিয়েছে। প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, কোম্পানিটি প্রতি শেয়ার ১০ টাকা মূল্যে মোট ১ কোটি ২০ লাখ শেয়ার ছেড়ে ১২ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে।
বাহ্যিকভাবে এই মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি সাধারণ মনে হলেও, খসড়া প্রসপেক্টাসটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু পদ্ধতিগত অসংগতি এবং শুভঙ্করের ফাঁকি বেরিয়ে আসে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পাওয়া গেছে যে কোম্পানির তিন পরিচালক একটি সিস্টার কনসার্নের প্রায় ৭০% মালিক এবং দুই প্রতিষ্ঠান একই ঠিকানা, একই কোম্পানি সেক্রেটারি ও একই সিএফও শেয়ার করে—অথচ প্রসপেক্টাসে তাদের মধ্যে ‘কোনো লেনদেন নেই’ বলা হয়েছে।
অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে রয়েল ফুটওয়্যারের কারসাজির সেই অন্দরমহল।
বিশেষ অনুসন্ধান: DSE-এর নেতিবাচক মতামতের অপ্রকাশিত ইতিহাস সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রয়েল ফুটওয়্যার ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে একই পরিমাণ অর্থ (১২ কোটি টাকা) তোলার জন্য প্রথমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-এর এসএমই প্ল্যাটফর্মে আবেদন করেছিল।
পরবর্তীতে কোম্পানিটি সেই আবেদন প্রত্যাহার করে নেয়। প্রকাশ্যে কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকট দেখানো হলেও, স্টক এক্সচেঞ্জ সংশ্লিষ্ট সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে, DSE-র পরিচালনা পর্ষদ কোম্পানিটির ব্যাপারে নেতিবাচক মতামত দিয়েছিল।
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর কোম্পানিটি ২০২৬ সালে হালনাগাদ আর্থিক তথ্যসহ পুনরায় আবেদন করে—এবং এবার লক্ষ্য ঢাকার বদলে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)। বর্তমানে আমরা যে প্রসপেক্টাসটি বিশ্লেষণ করছি, সেটিই এই পুনরায় জমা দেওয়া আবেদন—কারণ এতে উল্লেখিত আর্থিক পরিসংখ্যান (যেমন FY25-এর রাজস্ব ও EPS) সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
মূল উদ্বেগ: DSE ও CSE বাংলাদেশে দুটি স্বতন্ত্র এক্সচেঞ্জ, প্রতিটির নিজস্ব বোর্ড অনুমোদন প্রক্রিয়া আছে বলে এক এক্সচেঞ্জে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর অন্যটিতে আবেদন করা স্বাভাবিক। তবে সমস্যা হলো, CSE-র এই প্রসপেক্টাসে কোথাও উল্লেখ নেই যে একই কোম্পানি একই প্রস্তাব নিয়ে আগে DSE-তে গিয়েছিল এবং সেখানে নেতিবাচক মতামতের মুখে পড়েছিল। এটি এমন একটি তথ্য যা একজন বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি মূল্যায়নে সরাসরি প্রভাব ফেলার কথা, অথচ তা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছে।
আইন-QIO Rules, 2018 — Annexure-E, Instructions (4) ও (5)
(4) “…The prospectus/information memorandum should not make any statement that cannot be substantiated or may be misleading.
(5) “…the prospectus shall contain all material information necessary to enable investors to make an informed assessment of the business engaged in or to be engaged in by the issuer…
অর্থাৎ QIO Rules, 2018 (Annexure-E)-এর সাধারণ disclosure নীতি অনুযায়ী প্রসপেক্টাসে এমন সব তথ্য থাকতে হবে যা বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্তে materially প্রভাব ফেলতে পারে। DSE-এর নেতিবাচক মতামতের ইতিহাস গোপন রাখাটা এই নীতির সাথে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়।
১. সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন: “শূন্য লেনদেন”-এর ঘোষণা বনাম নিরীক্ষিত হিসাবের স্বীকারোক্তি
প্রসপেক্টাসের মূল অংশে, “Certain Relationships and Related Transactions” সেকশনে কোম্পানি স্পষ্টভাবে ব্ল্যাংকেট ঘোষণা দিয়েছে যে, গত দুই বছরে পরিচালক, কর্মকর্তা, ৫%-এর বেশি শেয়ারধারী বা তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে “কোনো লেনদেন হয়নি,” এবং পরিচালকদের কাছ থেকে/কাছে কোনো ঋণও নেওয়া-দেওয়া হয়নি।
কিন্তু এই ঘোষণাটি সরাসরি মিথ্যা প্রমাণিত হয় নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর Note 30.00 “Related Party Transaction”-এ।
এই নোটে কোম্পানি নিজেই স্বীকার করেছে যে প্রকৃতপক্ষে নিম্নলিখিত লেনদেনগুলো হয়েছে:
১. আল-মাদিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লি. — ফ্যাক্টরি জমি ভাড়া — সম্পর্ক: Common Directors — পরিমাণ (৬ মাসে): ১,২০,০০০ টাকা
২. আল-মাদিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লি. — বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ — সম্পর্ক: Common Directors — পরিমাণ (৬ মাসে): ৭৬,৫৯,২২০ টাকা
৩. স্মার্ট শুজ লিমিটেড — সাব-কন্ট্রাক্ট আয় — সম্পর্ক: Common Directors — পরিমাণ (৬ মাসে): ১৫,২১,০০০ টাকা
মোট লেনদেন (৬ মাসে) = ৯৩,০০,২২০ টাকা
এটি নিছক একটি “প্রশ্নবিদ্ধ দাবি” নয়—এটি নথির দুই ভিন্ন অংশের মধ্যে একটি সরাসরি, প্রমাণিত স্ববিরোধিতা, যা BSEC-অনুমোদিত দলিলে “সম্পূর্ণ ও সঠিক তথ্য প্রকাশ (Full and Fair Disclosure)”-এর দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
আইন: Bangladesh Securities and Exchange Commission (Qualified Investor Offer by Small Capital Companies) Rules, 2018 — Annexure-E, ধারা ৮(খ)
“Any transaction or arrangement entered into by the issuer… or entity owned or significantly influenced by a person who is currently a director… during the last three years prior to the issuance of the prospectus” [অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে]
এই ধারা অনুযায়ী গত তিন বছরের মধ্যে director-connected entity-র সাথে যেকোনো লেনদেন প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। Note 30-এর লেনদেন (Jul-Dec 2024 ও Jul-Dec 2025) এই সময়সীমার মধ্যেই পড়ে।
এই আইন অনুযায়ী, প্রসপেক্টাসে কোম্পানিকে অবশ্যই জানাতে হবে — গত তিন বছরের মধ্যে কোম্পানি এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন করেছে কিনা, যেখানে কোম্পানির কোনো director নিজেও পরিচালক বা উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী।
অর্থাৎ, “পরিবারের মধ্যে” লেনদেন লুকিয়ে রাখা যাবে না — সেটা সৎভাবে প্রকাশ করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারে টাকাটা সত্যিকারের ব্যবসায়িক লেনদেনে যাচ্ছে, নাকি পরিচালকদের নিজস্ব সুবিধায়।
Royal Footwear PLC-র প্রসপেক্টাসে স্পষ্টভাবে লেখা আছে “কোনো related-party লেনদেন নেই” — অথচ কোম্পানির নিজস্ব নিরীক্ষিত হিসাবের Note 30-এ কোম্পানি নিজেই স্বীকার করেছে, তারা Al-Madina Pharmaceuticals ও Smart Shoes Limited-এর সাথে লেনদেন করেছে — যেখানে Royal Footwear-এরই তিনজন director একসাথে পরিচালক। এটা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ (৭৬.৫৯ লাখ টাকা): কে কাকে পরিশোধ করেছে তা নোটে স্পষ্ট নয়। ফ্যাক্টরি জমি ভাড়া: কোম্পানির মূল উৎপাদন স্থাপনার জমিই একটি সিস্টার কনসার্নের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া—ভাড়ার শর্ত সত্যিই বাজারমূল্যে (Arm’s Length) কিনা তা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা কঠিন।
স্মার্ট শুজের সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্ট আয়: একই শিল্পের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উৎপাদন-সম্পর্কিত লেনদেন—মূল্য নির্ধারণ প্রকৃত বাজারমূল্যে নাকি মুনাফা/কর সমন্বয়ের (Transfer Pricing) উদ্দেশ্যে করা, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
পরিচালকদের জীবনবৃত্তান্ত থেকে প্রাপ্ত স্বার্থের জাল:-চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন পাটোয়ারী পরিচালক হিসেবে যুক্ত: আল-মাদিনা ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি, স্মার্ট শুজ লিমিটেড, রয়েল টয়লেট্রিজ, ম্যারিগোল্ড রিয়েল এস্টেট, ম্যারিগোল্ড অ্যাসোসিয়েট, টিউলিপ সুপার এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ।
এছাড়া তিনি এককভাবে (Proprietor) মালিক: আল-মাদিনা ফার্মাসিউটিক্যালস, আল-মাদিনা ট্রেডার্স, আল-মাদিনা প্রিন্টিং প্রেস, টেক স্কোয়ার্ড, “রয়েল শুজ” (Royal Shoes), এবং রয়েল মোটরস।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. বিল্লাল হোসেন-এর ব্যক্তিগত মালিকানায় আছে “M/S Belal and Brother” ও “M/S Sciencetech Corporation”। পরিচালক মো. কামরুল আলম-এর ব্যক্তিগত মালিকানায় আছে “M/S Care International”।
চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে “রয়েল শুজ” নামে একটি জুতার প্রতিষ্ঠানের মালিক—যা ইস্যুকারী কোম্পানি রয়েল ফুটওয়্যার পিএলসি-র সঙ্গে একই শিল্পে (জুতা) কাজ করে, এবং তিনি একই সঙ্গে স্মার্ট শুজ লিমিটেডেরও পরিচালক। এই ব্যাপক ক্রস-ওনারশিপ এবং সরাসরি স্বার্থের সংঘাত থাকা সত্ত্বেও “সম্পূর্ণ শূন্য লেনদেন”-এর দাবি করা বিনিয়োগকারীদের চরম অন্ধকারে রাখার সামিল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই “Common Directors” সম্পর্কটি নিছক প্রতীকী নয়—আল-মাদিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের নিজস্ব প্রসপেক্টাস (২০২৩) অনুযায়ী এই একই তিন পরিচালক (বিল্লাল হোসেন, জাকির হোসেন পাটোয়ারী ও কামরুল আলম) মিলে আল-মাদিনার ৬৯.৮৫% শেয়ারের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক।
অর্থাৎ দুটি প্রতিষ্ঠানই কার্যত একই তিনজন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন, যা এই লেনদেনগুলোর স্বার্থের সংঘাতকে আরও গভীর করে তোলে।
এই সম্পর্ক নিছক পরিচালনা পর্ষদ বা মালিকানা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়—দৈনন্দিন কর্পোরেট প্রশাসনও একই ব্যক্তির হাতে। রয়েল ফুটওয়্যার পিএলসি ও আল-মাদিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, উভয় প্রতিষ্ঠানেরই কোম্পানি সেক্রেটারি একই ব্যক্তি (মো. আনোয়ার হোসেন)।
আরও উল্লেখযোগ্য, দুই কোম্পানির রেজিস্টার্ড ও কর্পোরেট অফিসের ঠিকানা, ফোন/ফ্যাক্স নম্বর এবং এমনকি ফ্যাক্টরির ঠিকানাও হুবহু অভিন্ন (১৭৮-১৭৯, টু স্টার টাওয়ার, ইস্ট তেজতুরী বাজার, ফার্মগেট, ঢাকা এবং ১/১, তিলারগাঁতি, কাকিল, টঙ্গী, গাজীপুর)।
দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন শিল্পের (জুতা ও ফার্মাসিউটিক্যাল) প্রতিষ্ঠান একই ভৌত ঠিকানা ও প্রশাসনিক অবকাঠামো ভাগ করে নেওয়া—এটি উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কর্পোরেট স্বাধীনতা ও পৃথক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, দুই কোম্পানি একই রেজিস্টার্ড ও কর্পোরেট অফিস ভাগ করে নেওয়া সত্ত্বেও, রয়েল ফুটওয়্যারের আর্থিক বিবরণীতে “Administrative Expense” একটি সম্মিলিত লাইন আইটেম হিসেবে দেখানো হয়েছে—অফিস ভাড়া, ইউটিলিটি বা প্রশাসনিক খরচের কোনো বিস্তারিত ভাঙন নেই। সংশ্লিষ্ট-পক্ষ লেনদেনের নোটেও শুধু ফ্যাক্টরির জমি ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিলের উল্লেখ আছে, কিন্তু অভিন্ন হেড অফিসের ভাড়া বা খরচ কীভাবে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ হচ্ছে (বা আদৌ হচ্ছে কিনা) তার কোনো নির্দিষ্ট প্রকাশ বা নীতি প্রসপেক্টাসে নেই। এটি প্রশ্ন তোলে—একটি প্রতিষ্ঠান অন্যটির খরচ ভর্তুকি দিচ্ছে কিনা, এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মুনাফা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা।
শুধু কোম্পানি সেক্রেটারিই নয়, দুই প্রতিষ্ঠানের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (CFO)-ও একই ব্যক্তি—মো. আনিছুর রহমান, যিনি রয়েল ফুটওয়্যারের প্রসপেক্টাস অনুযায়ী মাসিক ২,৬০,০০০ টাকা বেতনে সিএফও হিসেবে কর্মরত এবং আল-মাদিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের নিজস্ব প্রসপেক্টাস (২০২৩)-এও একই নামে সিএফও হিসেবে তালিকাভুক্ত।
অর্থাৎ মালিকানা (৬৯.৮৫%), কোম্পানি সেক্রেটারি ও সিএফও—তিনটি স্তরেই দুই “স্বতন্ত্র” পাবলিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতপক্ষে একই ব্যক্তিদের হাতে।
একই ব্যক্তি দুই কোম্পানিতে CFO/Company Secretary থাকতে পারবে না
আইন: BSEC Corporate Governance Code, 2018 (Notification No. BSEC/CMRRCD/2006-158/207/Admin/80) — Condition ৩(১)(খ) ও (গ)
প্রতিটা তালিকাভুক্ত কোম্পানির CFO (আর্থিক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তা) ও Company Secretary (কোম্পানি সচিব) আলাদা আলাদা মানুষ হতে হবে, এবং এই দুইজনের কেউই একই সময়ে অন্য কোনো কোম্পানিতে একই ধরনের দায়িত্বশীল পদে কাজ করতে পারবেন না।
এর কারণ সহজ — একজন মানুষ যদি দুই কোম্পানির আর্থিক নিয়ন্ত্রণ একসাথে করেন, তাহলে দুই কোম্পানির মধ্যে স্বাধীন, নিরপেক্ষ তদারকি থাকে না — একজনের হাতেই সবকিছু, ফলে conflict of interest তৈরি হয়।
“The positions of… Company Secretary (CS), Chief Financial Officer (CFO)… shall be filled by different individuals… [এবং তারা] shall not hold any executive position in any other company at the same time।
এই Code-এর নোটিফিকেশনের শুরুতেই স্পষ্ট লেখা আছে:-imposes the following further conditions, i.e., Corporate Governance Code to the consent already accorded by it… to the issue of capital by the companies listed with any stock exchange in Bangladesh.
অর্থাৎ “any stock exchange in Bangladesh”-এ তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির জন্যই এই Code প্রযোজ্য, কোনো exclusion ছাড়া — SME/QIO প্ল্যাটফর্মের কোম্পানিও এর বাইরে নয়।
Royal Footwear PLC ও Al-Madina Pharmaceuticals Ltd — দুটো ভিন্ন পাবলিক কোম্পানিতে (দুই ভিন্ন শিল্প — জুতা ও ফার্মাসিউটিক্যাল) একই ব্যক্তি একসাথে CFO (মো. আনিছুর রহমান) এবং একই ব্যক্তি একসাথে Company Secretary (মো. আনোয়ার হোসেন) হিসেবে কর্মরত — যা দুই কোম্পানির নিজস্ব প্রসপেক্টাসেই স্বীকৃত। এটা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
লক্ষণীয়, দুই প্রসপেক্টাসেই এই CFO-র বেতন আলাদাভাবে প্রকাশিত—Royal Footwear-এ মাসিক ২,৬০,০০০ টাকা এবং Al-Madina-তে বাৎসরিক ৩০,০০,০০০ টাকা (≈২,৫০,০০০ টাকা/মাস)—অর্থাৎ তিনি সমান্তরালে দুই কোম্পানি থেকেই বেতন নিচ্ছেন।
একই ব্যক্তি দুই কোম্পানি থেকে সমান্তরালে বেতন নেওয়ার এই কাঠামোয় প্রকৃত ব্যয়-নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন তদারকি কতটা বজায় থাকছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
যখন দুই কোম্পানির দৈনন্দিন আর্থিক সিদ্ধান্ত, তহবিল ব্যবস্থাপনা ও ব্যয় অনুমোদন একই সিএফও-র মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন তাদের মধ্যকার লেনদেন সত্যিই স্বাধীন ও বাজারমূল্যে (arm’s length) হচ্ছে কিনা তা যাচাই করার মতো কোনো প্রকৃত স্বতন্ত্র তদারকিই অবশিষ্ট থাকে না। এই একই স্ববিরোধিতা নিয়ে দায়িত্বশীল প্রতিটি পক্ষের কাছে জবাবদিহি প্রয়োজন!
কোম্পানির মন্তব্য: কোম্পানির মন্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা প্রতিবারই পরে মন্তব্য পাঠানোর আশ্বাস দেয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাঠায়নি।
BSEC-এর মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালামের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি জানান… সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে তথ্য পেলে জানাবেন। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য বা তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইস্যু ম্যানেজারের মন্তব্য: বক্তব্য জানার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমেইলের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো সাড়া বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২. দুই প্রসপেক্টাসের তুলনা: টেমপ্লেট রিস্ক ফ্যাক্টর ও “Group Company” গোপন দুটো প্রসপেক্টাস সরাসরি তুলনা করে দেখা গেছে, এগুলো অবশ্যই হুবহু এক ডকুমেন্ট নয় (যেহেতু দুটো ভিন্ন কোম্পানি) — কিন্তু কিছু অংশ উদ্বেগজনকভাবে হুবহু মিলে গেছে।
পুরো “Risk Factors and Management’s Perception” অধ্যায়টা প্রায় হুবহু কপি-পেস্ট — জুতা কোম্পানি ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির জন্য একই বাক্য ব্যবহার হয়েছে (interest rate risk, exchange rate risk, industry risk — সব একই ভাষায়)। এমনকি একটা জায়গায় লেখা আছে “operational risk… due to lack of internal controls within the bank” — এটা প্রমাণ করে risk factor অংশটা আসলে কোনো তৃতীয় (ব্যাংকিং খাতের) কোম্পানির প্রসপেক্টাস থেকে টেমপ্লেট কপি করে বসানো, প্রতিটি কোম্পানির জন্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে লেখা নয়।
Al-Madina-র ২০২৩ সালের নিজস্ব প্রসপেক্টাসেই একটা “Financial Information of Group Companies” নামে বাধ্যতামূলক টেবিল আছে (QIO Rules-এর ধারা ৫(চ)(ম) অনুযায়ী), যেখানে তারা স্পষ্টভাবে “Royal Footwear Limited”, “Smart Shoes Limited” এবং “Royal Toiletries Limited”-কে নিজেদের “Group Companies” হিসেবে ঘোষণা করেছে — সাথে তিন বছরের (২০১৮-২০২০) আর্থিক তথ্যও দিয়েছে (Royal Footwear-এর বিক্রয়, মুনাফা, NAV ইত্যাদি)। কিন্তু Royal Footwear-এর ২০২৬ সালের প্রসপেক্টাসে এই “Group Companies” অধ্যায়টাই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
২০২৩ সালে Al-Madina নিজেই BSEC-কে জানিয়েছে যে Royal Footwear তাদের “group company” — অর্থাৎ এই group সম্পর্কটা কোনো অস্পষ্ট ধারণা নয়, এটা BSEC-এর কাছে আগে থেকেই একটা কোম্পানির নিজস্ব ফাইলিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত।
অথচ Royal Footwear তার নিজের ২০২৬ প্রসপেক্টাসে এই বাধ্যতামূলক disclosure section-টাই সম্পূর্ণ বাদ দিয়েছে — যেটা তাদেরও দেওয়ার কথা ছিল, ঠিক Al-Madina যেভাবে দিয়েছিল।
Al-Madina-র ২০২৩ প্রসপেক্টাসেও হুবহু একই বাক্য আছে (একই লাইন নম্বরের কাছাকাছি প্যাটার্নে)। অর্থাৎ এই টেমপ্লেট শুধু Royal Footwear-এর একার সমস্যা নয় — Prime Bank Investment (একই issue manager, দুই কোম্পানিরই) বছরের পর বছর ধরে একই generic risk-factor টেমপ্লেট copy-paste করে আসছে, কোম্পানি-নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ না করেই। এটা তাদের overall due-diligence মান নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
আইন: QIO Rules, 2018 — Annexure-B, ধারা (d) ও (j)
“issue manager নিজে প্রত্যয়ন করেন যে disclosures… true, fair and adequate, এবং risk factors কোম্পানি-নির্দিষ্টভাবে যাচাই করা হয়েছে — কিন্তু দুই ভিন্ন শিল্পের ক্লায়েন্টের প্রসপেক্টাসে হুবহু একই (‘within the bank’ সহ) টেমপ্লেট থাকা এই প্রত্যয়নের সাথে সাংঘর্ষিক।”
“Group Company” ঘোষণার সাংঘর্ষিকতা — সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট Al-Madina-র ২০২৩ প্রসপেক্টাস (পৃ. ৩৪) নিজেই আনুষ্ঠানিকভাবে Royal Footwear Limited, Smart Shoes Ltd. ও Royal Toiletries Ltd.-কে তার “Group Companies” হিসেবে ঘোষণা করেছিল (৩ বছরের financial data-সহ)।
অথচ Royal Footwear-এর ২০২৬ প্রসপেক্টাসে এই “Group Companies” অধ্যায়টাই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত — এটা QIO Rules, 2018-এর আরেকটা মিসিং mandatory disclosure, যা Al-Madina-র নিজের আগের ফাইলিং দিয়েই প্রমাণিত।
আইন: QIO Rules, 2018 — Annexure-E, ধারা ৫(চ)(ম)
“Financial Information of Group Companies… the related business transactions within the group and their significance on the financial performance of the issuer” [আইন অনুযায়ী অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে]
(QIO Rules, 2018-এর Annexure-E, ধারা ৫(চ)(ম) অনুযায়ী আবশ্যক এই অধ্যায় Royal Footwear-এর প্রসপেক্টাসে) সম্পূর্ণ অনুপস্থিত — একটা দ্বিতীয়, স্বতন্ত্র disclosure লঙ্ঘন।
প্রতিবেদক :- রয়েল ফুটওয়্যার পিএলসি-র প্রসপেক্টাস নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে একাধিক নির্দিষ্ট আইন লঙ্ঘন, তথ্যগত অসংগতি এবং সুশাসন-সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রমাণিত হয় — যার মধ্যে অন্তত তিনটি সরাসরি নির্দিষ্ট আইনি ধারার লঙ্ঘন (QIO Rules 2018 ধারা ৮খ, Corporate Governance Code ধারা ৩(১)খ-গ, এবং Group Company disclosure ধারা ৫চম)।
Related-party লেনদেন গোপন, একই CFO-CS দুই কোম্পানিতে, Group Company disclosure অনুপস্থিত — তবুও আটকায়নি অনুমোদন। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—BSEC-এর প্রণীত এসব আইন ও বিধানের কার্যকর প্রয়োগ কোথায়? কমিশন কি এসব বিষয় পর্যালোচনা করে সন্তুষ্ট হয়েই অনুমোদন দিয়েছে, নাকি বিষয়গুলো নজরে আসেনি?
যদি পর্যালোচনা করেও অনুমোদন দিয়ে থাকে, তবে কোন আইনি বা নীতিগত ভিত্তিতে তা করা হয়েছে? যথাযথ ব্যাখ্যা ছাড়া এই ধরনের অসংগতি দীর্ঘায়িত হলে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে BSEC-এর কাছ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত। ২য় পর্ব আসছে……………